আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন আচরণবিধিতে প্রচারের প্রচলিত কয়েকটি মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬’ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরিত ওই বিধিমালায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচারণা, ব্যয় এবং আচরণের বিষয়ে বেশ কিছু নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারে কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। ভবন, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা সরকারি স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে।
এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের ফল গেজেটে প্রকাশ পর্যন্ত প্রকাশ্য মিছিল বা শোভাযাত্রা করা নিষিদ্ধ থাকবে। ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেনসহ যেকোনো যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল বা শোডাউনও করা যাবে না। নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টার কিংবা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহারের সুযোগও থাকছে না।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারণার অনুমতি রাখা হয়েছে। এ ধরনের প্রচারণা শুরুর আগে কোন কোন মাধ্যম ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে তথ্য জানাতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনে প্রচারের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হবে, তা নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবেও দেখাতে হবে।
ডিজিটাল প্রচারণায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ সতর্কতা। কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণধর্মী বক্তব্য প্রচার করতে পারবেন না। এআই ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভোটারদের প্রভাবিত করতে টাকা, খাবার, পানীয় কিংবা উপহার দেওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যালয়কে নির্বাচনী প্রচারের বাইরে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার, পেশিশক্তির প্রয়োগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা চরিত্রহননমূলক বক্তব্যও আচরণবিধির আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোর বিষয়েও কড়াকড়ি থাকছে। সরকারি যানবাহন, প্রচার সরঞ্জাম বা অন্য কোনো সরকারি সম্পদ নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনা-নেওয়ার জন্য যানবাহন ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে নির্বাচনী ক্যাম্প, মাইক ও প্রচারণার ব্যয়ের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে।
নতুন বিধিমালায় আচরণবিধি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট নিয়ম ভঙ্গ করলে কিংবা ভঙ্গের চেষ্টা করলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে কমিশন।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে পরিস্থিতি ও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম, অর্থ বা পেশিশক্তির মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে প্রচারণা চালানোর মতো কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ফলে নতুন আচরণবিধির মাধ্যমে উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে প্রচারণায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সদ্য সংবাদ/এসএস