দেশের বাইরে অবস্থান করলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে দলের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা। সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, দেশে ফেরার পরিকল্পনা, নিরাপত্তা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।’
ছোট বোন শেখ রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নন বলেও জানান তিনি।
ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা আবারও জানান। তিনি বলেন, ডিসেম্বরকে বেছে নেওয়ার পেছনে বিশেষ কারণ রয়েছে। এটি বাংলাদেশের বিজয়ের মাস হওয়ায় ওই সময়েই দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘আগে না, ডিসেম্বর মাসেই যাবো আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেভাবেই আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
তবে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরেই হত্যার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। অন্য কারও জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চান না বলেও জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘প্রত্যেকের জীবনের ঝুঁকি আছে। আমি দেশে ফেরার জন্য নির্দেশনা দিয়ে কাউকে বিপদে ফেলতে চাই না।’
তিনি দাবি করেন, দেশের তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে এবং দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
‘বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান’
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা দাবি করেন, দেশে জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীদের উত্থানের খেসারত ভারতকেও দিতে হবে।’
বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা ও মৌলবাদী শক্তির বিস্তার ভারতের নিরাপত্তা এবং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন শেখ হাসিনা।
নির্বাচন ও তারেক রহমান প্রসঙ্গে মন্তব্য
বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গেও ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘ভারত সরকার কী ভেবে বাংলাদেশের নির্বাচন সমর্থন করল, তারেককে ফিরিয়ে আনল- সেটা ভারত সরকারই ভালো বলতে পারবে।’
তারেক রহমানের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি বিদেশে অবস্থান করেই রাজনীতি করেছেন। ভারত থেকে নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি তো বাধা দিইনি। আমি দিল্লি থেকে কথা বললেই দোষ?’
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দর-কষাকষি বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘আমার তো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়’
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। দেশের অবস্থা তাকে ব্যথিত করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার তো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, যখন দেখছি আমার দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
দেশে ফিরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষ কষ্টে থাকলে তাদের পাশে দাঁড়ানো তার দায়িত্ব।
তার ভাষায়, ‘আমি দেশের মানুষের কাছে যাব। কারণ, মানুষ এখন কষ্ট পাচ্ছে। তাদের পাশে আমাকে দাঁড়াতে হবে। তাতে যদি আমার জীবনও যায় যাবে। কিন্তু আমি মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।’
‘দেশটা আমার, আমি নিজেই যাব’
দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সরকার ট্রাভেল ডকুমেন্ট না দিলে কী করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ তার নিজের দেশ। সেখানে ফেরার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘দেশটা আমার। আমার বাবা এদেশ স্বাধীন করেছে। আমরা এই দেশেই ছোটবেলা থেকে মানুষ হয়েছি। আর রাজনীতিতো স্কুল জীবন থেকেই আমি শুরু করেছি। সেখানে আমার দেশে কেন আমাকে ফিরতে দেবে না, সেটাই আমার প্রশ্ন।’
বিএনপি সরকার ভারত সরকারের কাছে তাকে ফেরত দেওয়ার কথা বলছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যখন ফেরত দেওয়ার কথা বলছে তখন ফেরত কেন, আমি নিজেই যাব।’
তবে দেশে ফেরার অনুমতি না পেলে অন্য কোনোভাবে প্রবেশ করবেন কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেটা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবন থেকে ভারতে যাওয়ার ঘটনাও সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তার দাবি, দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা তার ছিল না এবং পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, সেটিও আগে থেকে জানা ছিল না।
তিনি জানান, হেলিকপ্টারে সীমান্ত পার হওয়ার পর তাকে জানানো হয় যে তারা ভারতে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি মনে করেছিলেন, তাকে টুঙ্গিপাড়ার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করেছি। তাদের লাশ ফেলার মাধ্যমে আমাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে কেন! এ অবস্থায় আমি বললাম আমার থাকার দরকার নেই। আমি চলে যাব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যাব কোথায়? আমি বললাম যে, আমি যাব টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে। যখন আমি এয়ারক্রাফটে তখন আমি জানলাম আমি এখানে (ভারত) চলে এসেছি।’
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে অভিযোগ
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন শেখ হাসিনা। তার ভাষ্য, ‘আমার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৬ লক্ষ মামলা দেওয়া হয়েছে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অভিযোগ করেন তিনি। বিভিন্ন থানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও পুলিশের সদস্যদের ওপর সহিংসতার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তার দাবি, ‘যত জঙ্গি, সন্ত্রাসী ছিল তাদেরকে তারা ছেড়ে দিয়েছে।’
এসব বিষয়ে সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান ও ব্যাখ্যা তুলে ধরেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি
শেখ হাসিনা জানান, তিনি আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তার দাবি, নির্যাতন ও নানা চাপের মধ্যেও তৃণমূলের মানুষ তার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
তিনি বলেন, ‘এখন আমি আমার তৃণমূলের মানুষদের সঙ্গে কথা বলছি। তাদেরকে কোপায়, মারে, অত্যাচার করে, নির্যাতন করে। এগুলি চলছে। তারপরও এই অবস্থায় মানুষ আমাদের সঙ্গে কথা বলে।’
দেশের পরিস্থিতি অনুকূল নয় উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনাও করেন শেখ হাসিনা। বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ তোলেন।
সবশেষে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সদ্য সংবাদ/এসকে