সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সেসব উদ্যোগের বাস্তব ফলাফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে, তা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেল এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আয়োজনে সড়ক নিরাপত্তা ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিবিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে দেশে সড়ক নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানো না হলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। শুধু সভা, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে তথ্যনির্ভর পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, কোন সড়ক বা এলাকায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কেন ঘটছে এসব বিষয় নিয়মিত বিশ্লেষণ করতে হবে। দুর্ঘটনার কারণ ও পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে সড়ক নির্মাণ, নকশা প্রণয়ন এবং বড় প্রকল্প গ্রহণের সময় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, প্রকল্পে কত টাকা খরচ হয়েছে তার হিসাব থাকলেও সেই ব্যয়ের বিপরীতে বাস্তবে কী অর্জন হয়েছে, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকল্প থেকে অর্জিত শিক্ষা যদি পরবর্তী কার্যক্রমে প্রয়োগ না হয়, তাহলে অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
সড়ককে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, নির্মাণের সময় থেকেই সড়কের নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। সড়কের অবস্থা একেবারে নষ্ট হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগেই সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমে পুলিশের জন্য বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দায়িত্বে ধারাবাহিকতা রাখা দরকার। এতে অর্জিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
এ ছাড়া দক্ষ চালক তৈরি, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন শেখ রবিউল আলম।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের প্রাণহানির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারও দায়িত্বহীনতা বা নিয়ম না মানার কারণে মানুষের প্রাণহানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
মন্ত্রী জানান, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ জোরদার করার কথাও বলেন তিনি।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সড়ক নিরাপত্তাকে কেবল প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ও সরাসরি যুক্ত। তাই সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পারস্পরিক সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক প্রকল্পের সুপারিশগুলো বাস্তবে প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা, হালনাগাদ ম্যানুয়াল নিয়মিত কাজে ব্যবহার এবং সওজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
কর্মশালায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর Qingfeng Zhang বলেন, বাংলাদেশে নিরাপদ ও টেকসই সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা ও টেকসই সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নয়নে এডিবি সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানান তিনি।
কর্মশালায় জানানো হয়, এডিবি ও জাপান ফান্ড ফর পোভার্টি রিডাকশনের (জেএফপিআর) সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ মেয়াদে সড়ক নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত কারিগরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর আওতায় দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনা, রোড সেফটি অডিট এবং সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সওজের সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে এডিবি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থ বিভাগ, সওজ, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, পরামর্শক সংস্থা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। কর্মশেষে নিরাপদ, স্মার্ট ও দীর্ঘস্থায়ী সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা।
সদ্য সংবাদ/এসএস