রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ দেড় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত কোটি মানুষের দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোট। ফ্যাসিবাদের পতনের পর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কেমন হবে, তা নির্ধারণে ব্যালটের রায়ে অংশ নিতে মুখিয়ে আছে গোটা জাতি।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তরুণ প্রজন্ম। মোট ভোটারের প্রায় ৪৫ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ। একই সঙ্গে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।
সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে ভোট স্থগিত রয়েছে। এবারের নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন।
সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এসব কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর তিন দফা হালনাগাদের পর মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন।
এই বিশাল ভোটার ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকছেন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার রয়েছেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন এবং পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা ভোটগ্রহণ কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করবেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটের মাঠে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, কোস্টগার্ড ও বিএনসিসিসহ প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ দায়িত্ব পালন করছেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জন প্রতিনিধি ছাড়াও কমনওয়েলথ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষকরা রয়েছেন। আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স ও এপির মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিক নির্বাচন কাভার করছেন।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো ও সন্তোষজনক। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টির বেশি অভিযোগ তদন্ত করা হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্টচক্র সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি জানান।