বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারের আমলেই গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। তবে তাঁর দাবি, বিএনপির শাসনামলে গণমাধ্যম তুলনামূলকভাবে বেশি স্বস্তিদায়ক পরিবেশে কাজ করতে পেরেছিল। তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে গণমাধ্যমকে সবচেয়ে বেশি নিপীড়ন, চাপ ও ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
রোববার, ২১ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মতিউর রহমান বলেন, গত ৫০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো সরকারের আমলেই সংবাদপত্রশিল্প পুরোপুরি সুস্থ পরিবেশ পায়নি। নানা সময়ে নানা সংকট ও চাপে পড়তে হয়েছে। তবে তুলনামূলক বিচারে বিগত ১৫–১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলেই গণমাধ্যম সবচেয়ে বেশি নিপীড়ন, ভয় ও চাপের মুখে পড়েছে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বিএনপির সময়ে গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বস্তিতে ছিল—এমন নয়, তবে তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতি ছিল অনেকটাই সহনীয়।
তিনি আরও বলেন, সামরিক ও বেসামরিক সব সরকারের মধ্যে বিগত ১৫ বছরই ছিল সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। এই সময়ে প্রথম আলোর ক্ষেত্রেও মালিকানা পরিবর্তন, সম্পাদক বদল বা শেয়ার বিক্রির মতো আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সময়কাল প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, বিএনপি সরকারের সময়ে দলটির কিছু বড় ভুল নিয়ে প্রথম আলো কঠোর সমালোচনা করেছে। সে সময় এসব লেখা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা ও তর্কও হয়েছে। তবু এসব সমালোচনার কারণে প্রকাশ্যে আক্রমণ, জেল বা মামলার ভয় তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, সমালোচনা ও তর্কের মধ্যেও বিএনপির নেতৃত্বের মধ্যে ধৈর্য ও সহনশীলতা ছিল। তারা সমালোচনা গ্রহণ করত, যদিও সেগুলো সংশোধন করতে পেরেছিল কি না—তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আরও বেশি সহিষ্ণুতা ও সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা দেখাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশে বর্তমানে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছে বলে মন্তব্য করে প্রথম আলোর সম্পাদক বলেন, এই পরিস্থিতি বিপজ্জনক এবং বিএনপির জন্যও কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। তাঁর মতে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যদি আরও আগে দেশে ফিরতে পারতেন, তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্নভাবে গড়ে উঠতে পারত।
বিএনপির নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচনী তালিকা ও প্রার্থী তালিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব বেশি উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে না। বিষয়টি দলটির ভেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে তিনি ইঙ্গিত দেন।
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার প্রসঙ্গ তুলে মতিউর রহমান বলেন, এই সংকটকালে দল-মত-নির্বিশেষে সব ধরনের গণমাধ্যম, সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেসক্লাব যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করার মতো। তাঁর মতে, এই ঐক্য ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের জন্য একটি ইতিবাচক সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনই দেশের সব সংকটের সমাধান। অতীতে তিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন নির্বাচন হবেই। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে এখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগছে—আগামী দিনগুলো কেমন যাবে, আগামী দুই মাস কীভাবে কাটবে এবং নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে।
আগামী সময় আরও কঠিন হবে উল্লেখ করে মতিউর রহমান বলেন, যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের জন্য সময়টা হবে গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে শক্তির উত্থান ঘটেছে, তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড এবং সারা দেশে যেভাবে মবতন্ত্রের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তনই একমাত্র পথ।
মতিউর রহমান বলেন, বিএনপি যদি সরকার গঠন করে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এত বিরোধ, বিভেদ ও সংকট নিয়ে কোনো দেশ বা সমাজ এগোতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।