ঈদে প্রবাসী আয়ের জোয়ার, স্বস্তি ফিরছে অর্থনীতিতে, তবু রয়ে গেছে হুন্ডির ছায়া

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩২
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ২৩ দিনে দেশে এসেছে প্রায় ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, ঈদকে কেন্দ্র করে পারিবারিক চাহিদা বৃদ্ধি, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের প্রতিযোগিতামূলক দর এবং সরকারি প্রণোদনার কারণে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে।

প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় ও ডলার সংকটের চাপে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, ঈদের আগে বাড়তি রেমিট্যান্স প্রবাহ আপাতত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। আসন্ন জাতীয় বাজেটসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায়ও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৩ মে পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এক বছরে আসা সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ শতাংশ।

ব্যাংকাররা বলছেন, ঈদের আগে সাধারণত প্রবাসীরা পরিবারের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠান। কোরবানির পশু কেনা, নতুন পোশাক, যাতায়াত ও উৎসবকেন্দ্রিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এ সময় রেমিট্যান্স প্রবাহে মৌসুমি উল্লম্ফন দেখা যায়। তাদের মতে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এ সময়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি অর্থ পাঠান প্রবাসীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “সব ব্যাংকেরই রেমিট্যান্স সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন এজেন্সি রয়েছে। এছাড়া বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো বৈদেশিক আয় সংগ্রহ করে থাকে। তবে চলতি মাসে রেমিট্যান্স সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। কিছু ব্যাংক প্রতি ডলারে ১২৩ টাকা পর্যন্ত দর দিচ্ছে।”

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এটিই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক আয়ের খাত। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সৌদি আরবপ্রবাসী শ্রমিক মো. সুমন বলেন, “ঈদের সময়ে পরিবারের চাহিদা মেটাতে অন্য সময়ের তুলনায় বেশি টাকা পাঠাতে হয়। কোরবানির ঈদে সেই প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু মৌসুমি কারণ নয়, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগও এ প্রবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে নগদ প্রণোদনা, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিস্তার এবং হুন্ডির বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানোয় আনুষ্ঠানিক প্রবাহ শক্তিশালী হয়েছে।

চলতি বছরের শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে দেশে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসছে। এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স ছিল প্রায় ৩ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। মার্চে তা রেকর্ড ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে ডলারের অস্থির বাজারও একটি কারণ। ব্যাংকগুলো বেশি দর দেওয়ায় প্রবাসীরা সাময়িকভাবে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের দিকে ঝুঁকছেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লেও হুন্ডির কার্যক্রম এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার কম হলে হুন্ডির চাহিদাও কমে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ আরও কমানো গেলে প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে বেশি আগ্রহী হতেন।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কিছুটা কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করার সুযোগও পেয়েছে।

এদিকে অর্থনীতির ধীরগতির মধ্যে সম্প্রতি প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে হুন্ডি। বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লেও অনানুষ্ঠানিক অর্থপাচার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ব্যাংকারদের মতে, ডলারের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলেই অনেক প্রবাসী আবার হুন্ডির দিকে ঝুঁকে পড়েন।

অগ্রণী ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক মোখলেসুর রহমান বলেন, “শুধু ডলারের রেট নিয়ন্ত্রণ করে হুন্ডি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ ব্যাংকগুলো ডলারের দর বাড়ালে হুন্ডি ব্যবসায়ীরাও দর বাড়িয়ে দেয়। তাই চোরাচালান ও অবৈধ অর্থপাচার বন্ধ করতে পারলে হুন্ডি নিয়ন্ত্রণেও কিছুটা অগ্রগতি আসবে।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঈদকেন্দ্রিক এই রেমিট্যান্স প্রবাহ আপাতত দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি, বৈধ চ্যানেলে সহজ লেনদেন নিশ্চিত করা এবং প্রবাসীদের আস্থা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. একাদশে ভর্তি: প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ সদ্য. ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ১,৭৫৩ সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আওয়ামী লীগের মিছিল: ওসির পর এবার গুলশান জোনের ডিসি প্রত্যাহার সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গোবিপ্রবি ভিসিকে উদ্ধার, পরদিন সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ সদ্য. হুথিদের ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের সামরিক সহায়তা চাইল সৌদি সদ্য. নতুন দুজনই প্রকৃত আসামি, র‍্যাবের গ্রেপ্তার ৩ জনের সংশ্লিষ্টতা নেই: ডিবি সদ্য. সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরাতে ভারতের সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সদ্য. একাদশে ভর্তি: প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ সদ্য. ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ১,৭৫৩ সদ্য. একনেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার তিন মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন সদ্য. পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা সদ্য. আওয়ামী লীগের মিছিল: ওসির পর এবার গুলশান জোনের ডিসি প্রত্যাহার সদ্য. আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভারত-পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজের মাঝে সংঘর্ষ সদ্য. ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গোবিপ্রবি ভিসিকে উদ্ধার, পরদিন সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগ সদ্য. হুথিদের ঠেকাতে যুক্তরাজ্যের সামরিক সহায়তা চাইল সৌদি সদ্য. নতুন দুজনই প্রকৃত আসামি, র‍্যাবের গ্রেপ্তার ৩ জনের সংশ্লিষ্টতা নেই: ডিবি সদ্য. সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফেরাতে ভারতের সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী