সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে যুক্ত হতে পারে ঋণ ও স্বাস্থ্যবিমার মতো নতুন সুবিধা। পাশাপাশি পেনশনারের মৃত্যুর পর তার স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়া এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে জমা অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় সভায় প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পেলে পরবর্তী ধাপে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, সর্বজনীন পেনশনে মানুষের আগ্রহ বাড়াতে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব পর্ষদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পর বিধিমালার সংশোধন সম্পন্ন হলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন সুবিধাগুলো চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
স্বামী বা স্ত্রী পাবেন আজীবন পেনশন
বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো পেনশনার পেনশন পাওয়ার সময় মারা গেলে তার নমিনি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাসিক পেনশন পান। নতুন প্রস্তাবে এ সুবিধার পরিবর্তন করে পেনশনারের স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে নমিনির পরিবর্তে স্বামী বা স্ত্রীকে পেনশনের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের প্রচলিত পেনশন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই এ উদ্যোগ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাবও আলোচনায় আসতে পারে।
বিশেষ প্রয়োজনে মিলবে ঋণ
সর্বজনীন পেনশন আইনে গ্রাহকের জমা অর্থের একটি অংশ বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখার বিধান রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সেই সুবিধা কার্যকর হয়নি।
নতুন উদ্যোগে নির্দিষ্ট প্রয়োজনের ক্ষেত্রে গ্রাহক তার জমা অর্থের একটি অংশ ঋণ হিসেবে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, ওই ঋণের বিপরীতে যে সুদ পাওয়া যাবে, তা সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পেনশন হিসাবে জমা হওয়ার কথা রয়েছে।
অক্ষম হলে তুলে নেওয়া যাবে জমা অর্থ
দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার পর হঠাৎ আর্থিক বা শারীরিক সংকটে পড়লে কী হবে- এ বিষয়েও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, অন্তত পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর কোনো গ্রাহক শারীরিক ও আর্থিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লে বিশেষ বিবেচনায় স্কিম থেকে বের হয়ে তার জমা অর্থ পুরোপুরি তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
মাসে ১০ থেকে ২০ টাকায় স্বাস্থ্যবিমা
পেনশন গ্রাহকদের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতেও পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় মাসে ১০ থেকে ২০ টাকা প্রিমিয়াম নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর বিনিময়ে পেনশনারদের স্বাস্থ্যবিমা সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
চালু হতে পারে শরিয়াহভিত্তিক স্কিম
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়াতে শরিয়াহভিত্তিক একটি স্কিম চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যারা প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নিতে আগ্রহী নন, তাদের জন্য এমন একটি বিকল্প তৈরির চিন্তা করা হচ্ছে।
প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি
বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করে সরকার। বর্তমানে ‘সমতা’, ‘সুরক্ষা’, ‘প্রগতি’ ও ‘প্রবাস’- এই চারটি স্কিম চালু রয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চারটি স্কিমে মোট নিবন্ধনকারী ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩২৭ জন।
তবে চালুর প্রায় তিন বছর পরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মানুষের অংশগ্রহণ হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। ব্যাংকের আমানতের তুলনায় পেনশন ব্যবস্থায় রিটার্ন এবং তাৎক্ষণিক সুবিধার বিষয়টি মানুষের আগ্রহে প্রভাব ফেলছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
সরকারের প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদন পাওয়ার পর বিধিমালা সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপরই নতুন সুবিধাগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সদ্য সংবাদ/এসকে