নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা জাহিদ আল আমিন বুলবুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি শেখ সিফাতকে আদালতে হাজির করার সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই আদালত চত্বরে তাকে মারধর করেন নিহতের স্বজন ও ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। পরে আসামিদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। শুনানি শেষে শেখ সিফাতসহ মামলার সাত আসামির ১০ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। একই মামলায় গ্রেপ্তার চার নারী আসামির তিন দিন করে রিমান্ড দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা চৌধুরীর আদালতে রিমান্ড শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হয়।
আদালত পুলিশের পরিদর্শক আবদুস সামাদ বলেন, আসামিকে আদালতে নেওয়ার সময় উপস্থিত লোকজন উত্তেজিত হয়ে তাকে মারধর করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ চেষ্টা করে। এ সময় বিক্ষুব্ধ কয়েকজন পুলিশের ওপরও হামলার চেষ্টা করেন বলে জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শেখ সিফাতকে আদালত প্রাঙ্গণে আনা হলে নিহত জাহিদ আল আমিনের স্বজন ও ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা তাকে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা স্লোগান দিতে থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশের নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যেই শেখ সিফাতকে লক্ষ্য করে কিল-ঘুষি ও লাথি দেওয়া শুরু হয়। এতে কিছু সময়ের জন্য আদালত এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
মারধরের সময় শেখ সিফাতের পোশাকও খুলে যায়। ঘটনার একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
যেভাবে হত্যা করা হয় জাহিদকে
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে বন্দরের সালেহনগর এলাকায় জাহিদ আল আমিনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন নিহতের ছোট ভাই জোবাইদ আল আমিন বাদী হয়ে বন্দর থানায় মামলা করেন।
মামলায় ৪০ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
জাহিদ আল আমিন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বন্দর দক্ষিণ শাখার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের বন্দর থানা শাখায় আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে শেখ সিফাতসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
বিরোধের সূত্রপাত নিয়ে পুলিশের বক্তব্য
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের খাবার সরবরাহকে কেন্দ্র করে জাহিদ আল আমিনের সঙ্গে শেখ সিফাতসহ কয়েকজনের বিরোধ তৈরি হয়। পরে জাহিদের অটোরিকশার গ্যারেজে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। ওই বিরোধের জেরে জাহিদকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও জড়িতদের বিচারের দাবিতে রোববার জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিহতের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার জাহিদ হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা। প্রায় আধা ঘণ্টা সড়ক অবরোধ থাকায় ওই পথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
‘পুষ্পা’ স্টাইলের অঙ্গভঙ্গি নিয়ে আলোচনা
হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর শুক্রবার শেখ সিফাতকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে তিনি ‘পুষ্পা’ সিনেমার একটি চরিত্রের অনুকরণে অঙ্গভঙ্গি করেন। ওই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
এর একদিন পরই আদালত প্রাঙ্গণে তাকে মারধরের ঘটনা ঘটল। এখন মামলার তদন্তের পাশাপাশি আদালত চত্বরে পুলিশের নিরাপত্তার মধ্যেও আসামির ওপর হামলার ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে