পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত এতিমখানা এলাকার পানির পাম্প হাউসটি নাগরিকদের কোনো কাজে আসছে না। ব্যাপক দুর্নীতি, আর অনিয়মে নির্মিত এ পাম্প থেকে ৫৭ লক্ষ লিটার পানি উত্তোলনের পরেও পানির সাথে অনবরত বালু ওঠার কারণে এটি বন্ধ রেখেছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী নাগরিকদের লিখিত অভিযোগের পর পৌরসভা প্রশাসক সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। এরপর দায়সারা গোছের প্রতিবেদন দাখিল হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি পৌর প্রশাসন। নাগরিকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটে পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌরসভার নাগরিক সেবার এখন চরম বেহাল দশা।
সূত্র জানায়, ‘ক’ শ্রেণীর কলাপাড়া পৌরসভার পানির গ্রাহক রয়েছে ৪৮৬০ জন। পানি শাখার দুইটি জেনারেটর আছে। যা ক্রয়ে অনিয়ম করায় অধিকাংশ সময় বিকল থাকছে। তাই বিদ্যুৎ না থাকলে ওভারহেড ট্যাংকে পানি উত্তোলন হচ্ছে না। এছাড়া ৫ লক্ষ লিটার ধারণক্ষমতার ওভারহেড ট্যাংক রয়েছে ২টি, পাম্প হাউস ৪টির মধ্যে ১টিতে বালু ওঠায় বন্ধ।
অথচ ২৪ ঘণ্টায় নাগরিকদের পানির চাহিদা রয়েছে ২৮ লক্ষ লিটার। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকলে উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে ১৫-২০ লক্ষ লিটার। আর বিদ্যুৎ না থাকলে পানি নেই। এতে অজু, গোসল, রান্নাসহ গৃহস্থালি সব কাজে ভোগান্তি বেড়েছে নাগরিকদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে পৌরসভা তহবিল থেকে ১৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১টি জেনারেটর ক্রয় করা হয়। আরেকটি দেয় ইউওএসএইচ প্রকল্প থেকে। কাগজে-কলমে নতুন দুইটি জেনারেটর ক্রয়ে মোটা অংকের বিল-ভাউচার দেখানো হলেও কোনো কাজে আসছে না। স্বল্পমূল্যে সেকেন্ড হ্যান্ড জেনারেটর ক্রয়ের কদিন না যেতেই বিকল হয়ে পড়ে। এরপর প্রায়ই জেনারেটর মেরামতের বিল-ভাউচার করা হয়েছে।
এদিকে পৌরসভার সদ্য নির্মিত ৭০ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানির পাম্পটি নকশা এড়িয়ে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাথে ৬ ইঞ্চি সংযোগ পাইপ সড়কের এক মিটার নিচে না রেখে মাত্র ১০ সেন্টিমিটার নিচে দেওয়া হয়েছে। ভূগর্ভস্থ ১০৩০ থেকে ১১৩০ পর্যন্ত দেওয়া ফিল্টারটি দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের। টুকরো ছেঁড়া তার দিয়ে পানির মটরের সাথে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। এতে এতিমখানা পানির পাম্প চালু করতে গিয়ে পানি শাখার মিজানুর রহমান গুরুতর আহত হন। তার চিকিৎসার খরচ বহন করতে হয় পৌরসভাকেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানায়, ইজিপি টেন্ডারে পৌরসভার এতিমখানা এলাকার পানির পাম্প নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বরগুনার কামাল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিযুক্তি লাভ করে। স্থানীয় কয়েক প্রভাবশালী, যাদের সাথে ব্যবসার অংশীদার থাকেন সদ্য বিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর রহমান।
ফলে পৌরসভার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকালে নির্মাণ কাজে অনিয়মের প্রতিবাদকারী এক সাংবাদিকের জামার কলার ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হন আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউর। এছাড়া কলাপাড়া ছাড়ার প্রাক্কালে জনৈক কাজল মৃধার কাছ থেকে উৎকোচ নেয়া ২০ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে যেতে বাধ্য হন মশিউর।
পৌরসভার এতিমখানা ৪ নং ওয়ার্ডের নাগরিক ও সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির স্টেকহোল্ডার সদস্য মো: আলাউদ্দিন তালুকদার জানান, পৌরসভার সদ্য নির্মিত পানির পাম্প হাউসটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হয়নি। নতুন নির্মাণ কাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম করা হয়েছে। যাতে এটি নাগরিকদের কোনো কাজে আসছে না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কামাল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো: কামাল খান বলেন, পাম্প হাউসটি আমার লাইসেন্সে ওরা ৪-৫ জন করেছে। যেহেতু কাগজ-কলমে কাজটি আমি করেছি,তাই এর দায়ভার আমাকেই নিতে হবে। আমার টেকনিক্যাল এক্সপার্টরা এটি সচল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে।
পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মজিবুল হায়দার বলেন, এটি আমার যোগদানের পূর্বে নির্মাণ করা হয়েছে। অফিস ডকুমেন্ট অনুযায়ী বিষয়টি তাদের অবগত করা হয়েছে। তাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্ট এসে এটি সচল করার পদক্ষেপ নেবে। তাদের এক বছরের মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব রয়েছে। এছাড়া তাদের জামানতের টাকা জমা আছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে