অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম যে প্রতিকূলতাকেও হার মানাতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ কুড়িগ্রামের বিশাল সরকার কৌশিক। সংসারের অভাব ঘোচাতে কখনো খাবার হোটেলে কর্মচারী, কখনো দিনমজুর, আবার কখনো টিউশনি করিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন তিনি। এত সংগ্রামের মধ্যেও পড়ালেখায় ছেদ পড়তে দেননি। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন এই শিক্ষার্থী।
তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার পরও স্বস্তিতে নেই বিশাল। তার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। কিন্তু পরিবারের ঋণের বোঝা আর আর্থিক অনটন উচ্চশিক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে সমাজের সহৃদয় মানুষ ও বিত্তবানদের সহযোগিতা প্রয়োজন তার।
বিশাল কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়ী বাজারসংলগ্ন এলাকায় পরিবারের বসবাস। অন্যের জমিতে জরাজীর্ণ তিনটি চালাঘরই তাদের আশ্রয়। টিনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, বাঁশঝাড়ের পাশে খোলা জায়গায় রান্নার ব্যবস্থা। এমন পরিবেশেই বড় হয়েছেন বিশাল ও তার ভাইবোনেরা।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই অভাব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পর ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসিতেও সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এরপর চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিজ্ঞান বিভাগে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে ভর্তি হন। এইচএসসিতেও ধরে রাখেন সাফল্যের ধারাবাহিকতা।
পড়াশোনার খরচ চালাতে বিশালকে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে। কখনো খাবার হোটেলে বয়ের কাজ, কখনো দিনমজুরি, আবার কখনো শিক্ষার্থী পড়িয়ে অর্থ উপার্জন করেছেন। অর্থের অভাবে অনেক দিন অটোরিকশা ভাড়া দিতে না পেরে স্কুল-কলেজে যাওয়া হয়নি। কখনো দিন কেটেছে না খেয়েও। তবু পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি তিনি।
বিশাল জানান, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট ও জুতা পরে ক্লাস শুরু করেছিলেন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত আর্থিক সংকটের কারণে প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পাননি। পরে কয়েকজন শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে তাকে পড়িয়েছেন। কলেজেও শিক্ষক ও এক প্রবাসীর সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছেন।
বিশালের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে আয়ার কাজ করেন। বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা নিয়েও সপ্তাহে দুই দিন হাটবারে ছোট একটি টি-স্টল পরিচালনা করেন। পরিবারের আয়ের উৎস সীমিত। ২০২০ সালে সড়কের পাশের বসতঘর ও দোকান উচ্ছেদ হওয়ার পর এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগানে আশ্রয় নেয় পরিবারটি।
অভাবের কারণে দুই এনজিও থেকে নেওয়া ঋণও এখন পরিবারের জন্য বড় চাপ। গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার এবং আশা থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন বিশালের মা। সাপ্তাহিক কিস্তি দুই হাজার ৩০০ টাকা। কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খেয়ে আরও ৫০ হাজার টাকা ধার করতে হয়েছে তাদের। ফলে বিশালের ভালো ফলের আনন্দের পাশাপাশি পরিবারের সামনে এখন বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ ও তার উচ্চশিক্ষার ব্যয়।
বিশালকে জীববিজ্ঞান পড়িয়েছেন চিকিৎসক নন্দন কুমার দেব। তিনি বলেন, বিশাল অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে সে নিজের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হোক, এমন প্রত্যাশাও করেন তিনি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রোস্তম আলী জানান, বিশালের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। হোটেলে কাজ করেও ছেলেটি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী আলমগীর হোসেনের মতে, সরকারি সহায়তা ও বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে বিশাল তার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
বিশালের বড় ভাই কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়ছেন। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালান তিনি। ছোট ভাইয়ের ফলাফলে আনন্দিত হলেও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় বিশালের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন সবাই।
বিশালের মা কণা রানীও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানান। সামান্য আয়ে সংসার চালানো, ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং সন্তানের উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ছেলের স্বপ্ন পূরণে সহায়তার জন্য সমাজের হৃদয়বান মানুষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন বিশাল সরকার কৌশিক। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে এই মেধাবী শিক্ষার্থী একদিন চিকিৎসক হয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি পরিবারের দুঃখ-কষ্টও ঘোচাতে পারবেন এমন প্রত্যাশা তার স্বজন ও এলাকাবাসীর।
সদ্য সংবাদ/এসএস