খসড়া সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর কয়েকটি বিধান জনগণের মৌলিক অধিকার, বাক্স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে খসড়াটি নতুন করে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত আইনে সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা এবং মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার তিনটি পৃথক ও জটিল বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে। এর ফলে কোনো ক্ষেত্রই যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। বরং বিভিন্ন বিধানের অপব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা বাড়ছে।
তাঁর মতে, সাইবার অপরাধ ও সাইবার সুরক্ষার মতো বিশেষায়িত বিষয়কে একত্র করার পাশাপাশি অনলাইনে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও একই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা এবং এ ধরনের আইন থেকে তা বাদ রাখা উচিত। টিআইবির ভাষ্য, এমন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
খসড়াটি বর্তমান অবস্থায় অনুমোদন পেলে দেশের সাইবার পরিসর ব্যাপক নজরদারি, জবাবদিহিহীনতা ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর অভিযোগ, গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর এবং ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’-এর মতো বিষয়গুলো খসড়া আইনে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার ইচ্ছামতো ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিধানগুলোর লক্ষ্যভিত্তিক অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘যৌন হয়রানি’ ও ‘সেক্সটর্শন’-এর সংজ্ঞা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, খসড়ায় এসব শব্দের ব্যাখ্যা যথেষ্ট পেশাদার ও পূর্ণাঙ্গ নয়। এর ফলে প্রকৃত অপরাধ আড়াল হওয়ার পাশাপাশি অভিযুক্তের সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীর অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খসড়া আইনের ৪৬(২) ধারায় অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে ২৩ ধারাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২৩ ধারায় দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ‘বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ এবং ‘বৈদেশিক কোনো রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুবিধার্থে’-এর মতো বিষয় রাখা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় বিধানগুলোর প্রয়োগ ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। এতে ভিন্নমত ও বাক্স্বাধীনতা দমনের জন্য আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
প্রস্তাবিত জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, প্রধানমন্ত্রীসহ ২৮ সদস্য নিয়ে কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে বেসরকারি পর্যায়ের তথ্যপ্রযুক্তি ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র দুজনকে রাখার কথা বলা হয়েছে। আবার তাঁদেরও সরকার মনোনয়ন দেবে। ফলে কাউন্সিলটি সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থেকে জবাবদিহিহীনভাবে আইনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ও যথেচ্ছ প্রয়োগের ক্ষমতা পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে টিআইবি।
এ অবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার পর বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারের বদলে ওই কাউন্সিলের হাতে দেওয়ারও প্রস্তাব করেছে তারা।
এ ছাড়া কাউন্সিলের সদস্য এবং আইনের অধীনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘সরল বিশ্বাসে’ করা কর্মকাণ্ডের জন্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা থেকে দায়মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এ ধরনের দায়মুক্তি ‘আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’, এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া খসড়াটি অনুমোদন করা হলে দেশের সাইবার পরিসর ব্যাপক নজরদারি, জবাবদিহিহীনতা ও নিপীড়নের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এতে জনগণের প্রবেশাধিকার সরকারের ইচ্ছানির্ভরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার পাশাপাশি ভিন্নমত দমন ও মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনও স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হতে পারে।
বিবৃতির শেষ দিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সব নাগরিকের সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, সেটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে টিআইবি।
সদ্য সংবাদ/ এআর