প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, দেশ পরিচালনার পরিবর্তে দুর্নীতি, লুটপাট ও দখলদারত্বের পরিকল্পনা নিয়েই লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন তারেক রহমান।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিকেল ৪টার পর পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গত এক সপ্তাহে এনসিপির নেতারা ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁদের সমস্যার কথা শুনেছেন। মানুষের বাসায় গ্যাস নেই, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও রাহাজানিতে দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
সরকারের এ ব্যর্থতার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। সেই গণরায় উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, দুজনই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। একতরফা সংবিধান সংশোধন কমিটি বাতিল করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, বিএনপি সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই জুলাই সনদ, ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আসছে। তিনি বলেন, ‘হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা একটি স্বৈরাচারকে বিদায় করেছি। কিন্তু এখন নতুন করে আরেক স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি। আপনাদের সামনে আমাদের ওয়াদা, পতিত স্বৈরাচার ও নব্য স্বৈরাচার—এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব।’
আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের পতিত স্বৈরাচার দেশে ফিরতে পারে—এমন আলোচনা রয়েছে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, বর্তমান সরকার আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে পারবে না।
এ সময় তিনি মন্তব্য করেন, গত ১৬ বছরেও বিএনপি আওয়ামী লীগের হাত থেকে বাংলাদেশের জনগণকে রক্ষা করতে পারেনি। মুজিববাদী ও ফ্যাসিবাদী শক্তির পাশাপাশি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নামার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তে হত্যা চলছে, পাহাড়ে অশান্তি তৈরি করা হচ্ছে। ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নিপীড়ন করা হচ্ছে এবং দিল্লিতে মসজিদ ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের মুসলমানদের নিয়েও প্রতিবেশী দেশ ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফেলানিসহ অতীতে সংঘটিত কয়েকটি সীমান্ত হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের আমলেও এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। ভারতের ষড়যন্ত্র থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ বলেন, বাংলাদেশকে আবারও ভারতের করিডর হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। ভারতের হাতে করিডর তুলে দেওয়ার এ অপচেষ্টা দেশের জনগণ মেনে নেবে না।
আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, চুক্তিটি নতুন করে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পাদন করতে হবে। বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রশ্নে জনগণ কোনো ছাড় দেবে না। অন্যথায় তাঁরা আবারও রাজপথে নামবেন।
দেশে গুম ও নৈরাজ্য চলছে অভিযোগ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এসব ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় তাঁদের আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই মিছিল সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে। সেই মিছিল নিয়ে আমরা জনাব তারেক রহমানকে ঘেরাও করে দাবি আদায় করে ছাড়ব।’
গণবিক্ষোভ সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, আবদুল্লাহ আল আমিন, মনিরা শারমিন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য আতিক মুজাহিদ, সারোয়ার তুষারসহ অনেকে।
সমাবেশ থেকে এনসিপির পক্ষ থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—ব্যর্থতার দায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ; একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের গণরায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন; মানবাধিকার ও বাক্স্বাধীনতাবিরোধী সব আইন বাতিল এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী পাস না করা; জুলাই গণহত্যার বিচার সম্পন্ন করে অবিলম্বে রায় কার্যকর করা।
সদ্য সংবাদ/ এআর