চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া এবং কাজের যথাযথ বাস্তবায়ন ছাড়াই বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও উন্নয়নকাজে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি গোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তুলনামূলক কম দর প্রস্তাব করা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে বেশি দরদাতাকে কাজ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি তাঁদের।
এ নিয়ে আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংস্কারকাজের একটি প্রকল্প। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের দরজা-জানালা মেরামত, ভবনের প্লাস্টার, রং এবং সিভিল ও স্যানিটারি সংস্কারের জন্য প্রায় ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। দরপত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কম দর দিলেও প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি দর প্রস্তাব করা একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি কাজের অগ্রগতি ও গুণগত মান যথাযথভাবে যাচাই না করেই বিল পরিশোধের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
এই অনিয়মের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাকির হোসেনের পাশাপাশি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রিয়াদুন উন নবী, সহকারী প্রকৌশলী ফরহান শাহরিয়ার এবং উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও করা হয়েছে। তাঁদের যোগসাজশে দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প তদারকি ও বিল পরিশোধে অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাদার বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম রাজুসহ কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগে সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ায় অন্যরা কাজ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের মতে, দরপত্র থেকে শুরু করে কাজের মান যাচাই ও বিল পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে জাকির হোসেনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, তাঁর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য প্রায় এক কোটি এবং ৯০ লাখ টাকা মূল্যের দুটি গাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া সোনালী ব্যাংকে তাঁর নামে ১০টি এবং স্ত্রীর নামে ছয়টি এফডিআর থাকার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে ১৫টি সঞ্চয়পত্র রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের নামেও বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব ও সম্পদ থাকার দাবি করেছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, জাকির হোসেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, কাজের পরিমাপসংক্রান্ত নথি, সমাপ্তির সনদ, বিল-ভাউচার এবং অর্থ ছাড়ের কাগজপত্র পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন ঠিকাদাররা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সম্পর্ক খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের ভাষ্য, এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তাঁরা হতাশ। এবার জাকির হোসেনের আয়-ব্যয়, ব্যাংক হিসাব ও পারিবারিক সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি তদন্ত চলাকালে তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দুদক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সামনে মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনেরও ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
সূত্র: দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি
সদ্য সংবাদ/এসএস