ছাত্রজীবনে ছাত্রনেতা, কর্মজীবনে অর্থনীতির শিক্ষক ও সরকারি কর্মকর্তা। এরপর পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং সবশেষে দলের মহাসচিব দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন ৭৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।
তৃণমূল থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসা মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন যেমন দীর্ঘ, তেমনি নানা বাঁক ও প্রতিকূলতায় ভরা। ছাত্ররাজনীতির উত্তাল সময় থেকে শুরু করে সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ ও মন্ত্রিসভা বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুইবারের সদস্য ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন মির্জা ফখরুল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়।
ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি। এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন মির্জা ফখরুল। তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের অভিজ্ঞতাও হয় তাঁর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি চাকরিতে থাকাকালে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সরকারি প্রশাসনের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি চাকরির পথ ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে পুরোপুরি রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি।
সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার পর ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। স্থানীয় পর্যায়ের এই দায়িত্বই তাঁর রাজনৈতিক জীবনে তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন তিনি। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
দলের সাংগঠনিক বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে করতে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসেন মির্জা ফখরুল। বিএনপির জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন তিনি। সংগঠনটির প্রথম সহসভাপতি এবং পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়ী হতে পারেননি। পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
মির্জা ফখরুলের জাতীয় পর্যায়ের দলীয় নেতৃত্বে উত্থানও ছিল ধাপে ধাপে। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়।
এরপর ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। প্রায় পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল।
এরপর থেকে টানা এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দলের সংকটময় সময়ে মহাসচিব হিসেবে দলীয় কর্মসূচি, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সামনে থেকে ভূমিকা রাখেন।
বিএনপির ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন মির্জা ফখরুল। একদিকে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস ও পরবর্তীতে অসুস্থতা, অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান এই পরিস্থিতিতে দেশে থেকেই দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাঁর ওপর পড়ে।
বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার কথা বিভিন্ন সময় তুলে ধরেছেন বিএনপির নেতারা।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলীয় নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক বক্তব্য, সংবাদ সম্মেলন এবং মাঠের কর্মসূচিতে নিয়মিত উপস্থিতির মাধ্যমে দলের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগও ধরে রাখেন তিনি।
দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালনের পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলের সংকটকালীন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে প্রার্থী করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলে দলীয় রাজনীতির সক্রিয় নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবেন মির্জা ফখরুল। ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলায় এটি হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি।
মির্জা ফখরুল নিজেও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী হলেও তাঁর পারিবারিক শিকড়ও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং বাংলাদেশের সংসদ সদস্য। পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভায়ও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মির্জা ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক। তিনি ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাঁদের দুই মেয়ে-মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শেষে অবসর নিয়েছেন।
বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণায় রয়েছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া পথচলা তাঁকে নিয়ে গেছে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির জগতে। সেখান থেকে তৃণমূলের পৌর রাজনীতি, জেলা বিএনপির নেতৃত্ব, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিত্ব এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে পৌঁছেছেন তিনি।
প্রায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মির্জা ফখরুলের এই দীর্ঘ পথচলায় যেমন রয়েছে আন্দোলন-সংগ্রাম, তেমনি রয়েছে কারাবরণ, নির্বাচনী রাজনীতি ও দলীয় নেতৃত্বের নানা অভিজ্ঞতা।
এবার সেই রাজনৈতিক পথচলার নতুন অধ্যায় রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়া। বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে তৃণমূলের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রনেতা, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব বিভিন্ন পরিচয় পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর সম্ভাব্য অভিষেক বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।
সদ্য সংবাদ/এসএস