গত ১০ বছরে নৌপরিবহন খাতে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে ভোলার ইলিশা নৌপথে সরাসরি ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন খাতের লোকসান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, গত ১০ বছরে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এর অন্যতম কারণ যাত্রীসংকট।
মন্ত্রী বলেন, নৌপথকে যাত্রীবান্ধব ও দূষণমুক্ত করা গেলে এ খাতে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা ও নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তার পাশাপাশি ওয়াটার বাস থেকে নেমে যাত্রীদের স্থলপথে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক পরিবহনসহ অন্যান্য সংযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
তিনি বলেন, ‘মানুষ তখনই আগ্রহী হবে, যখন সে একটি স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য যাত্রা এখানে পাবে। ওয়াটার বাসসহ আধুনিক নৌযান চালুর বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি। পাশাপাশি পর্যটন ও ওয়াটার বাস খাতে থাকা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।’
কাঁচপুর-ইলিশা ফেরি সার্ভিস প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ভোলা একটি দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে। এর মধ্যে কাঁচপুর-ইলিশা নৌপথে সরাসরি ফেরি সার্ভিস ভোলার মানুষের জন্য একটি প্রয়োজনীয় ও জনবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, ‘পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকদিন পরিচালনার পর দেখা গেছে, মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া, উৎসাহ ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এজন্য ফেরির মান ও সংখ্যা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে আমরা আরও বিস্তারিত আলোচনা করছি। পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ভোলার সঙ্গে ঢাকা ও দেশের মূল ভূখণ্ডের সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করতে স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর আগ পর্যন্ত ফেরি যোগাযোগকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ থাকবে।
বর্তমানে এই রুটে দুটি ফেরি চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যেহেতু এটি জনপ্রিয় একটি রুট হয়ে উঠছে এবং মানুষের চাহিদা রয়েছে, তাই এটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। মানুষের চাহিদা যেখানে রয়েছে, সেখানে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজনে বেসরকারি উদ্যোগকেও বিবেচনা করা হবে।
ফেরির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বিআরটিসির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ফেরির সংখ্যা বাড়ানো এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে কাঁচপুর ফেরিঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধন করেন মন্ত্রী।
ভোলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ ও দ্রুততর করার লক্ষ্যে গত ২৭ আগস্ট থেকে কাঁচপুর-ইলিশা রুটে পরীক্ষামূলকভাবে সরাসরি ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। বর্তমানে এ রুটে বিআইডব্লিউটিসির ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ও ‘বেগম রোকেয়া’ নামের দুটি ফেরি চলাচল করছে।
এদিকে ফেরি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাঁচপুর-ইলিশা রুটে ফেরি বিরতিহীনভাবে চলাচল করবে। প্রতিটি ফেরির ধারণক্ষমতা প্রায় ২৮০ টন। প্রাথমিকভাবে নিয়মিত যাওয়া-আসা করবে ফেরিগুলো। নির্দিষ্ট সময়সূচি পরবর্তীতে চূড়ান্ত করা হবে।
প্রতিদিন উভয় প্রান্ত থেকে একটি করে ফেরি ছেড়ে যাবে। কাঁচপুর থেকে ইলিশা যেতে এক ট্রিপে সময় লাগবে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। তবে ফেরি চলাচলের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সরাসরি ফেরি যোগাযোগ চালু হওয়ায় ভোলার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। বিশেষ করে ব্যবসায়ী, পণ্য পরিবহনকারী ও ট্রাকচালকদের মধ্যে এ রুট নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসি বলছে, কাঁচপুর-ইলিশা সরাসরি ফেরি সার্ভিস চালুর ফলে ভোলার মানুষের যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আয়ও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এতদিন ভোলা থেকে ঢাকা বা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াতে যেখানে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা সময় লাগত, সরাসরি ফেরি সার্ভিসের মাধ্যমে তা কমে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টায় নেমে আসবে।
এর আগে ২৭ আগস্ট থেকে কাঁচপুর-ইলিশা রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়।
সদ্য সংবাদ/এআর