বিদেশের মাটিতে যখনই বাংলাদেশের গান গেয়ে ওঠেন, শ্রোতাদের মনোযোগ কেড়ে নেন তিনি। কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংগীত ও শিল্পচর্চার মাধ্যমে তুলে ধরছেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তিনি ওয়ালিদ ইসলাম।
ইরানের তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই কূটনীতিকের জীবনপথও বেশ ব্যতিক্রমী। নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নিজের মেধা ও যোগ্যতায় দেশের পররাষ্ট্র ক্যাডারে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। পরিচিতি পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে।
গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া ওয়ালিদের শৈশব কেটেছে যশোরে। আট ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠার সময়ই বড় ধাক্কা আসে তাঁর জীবনে। মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও মা আমিনা বেগম ও ভাইদের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে যান।
শৈশব থেকেই লিঙ্গবৈচিত্র্যের কারণে সামাজিক বৈষম্য ও বিদ্রূপের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। চলাফেরা কিংবা কথা বলার ধরন নিয়ে শুনতে হয়েছে নানা কটূক্তি। তবে পরিবারের সমর্থন তাঁকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে গেছেন তিনি।
উচ্চশিক্ষার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হন ওয়ালিদ। সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন। প্রথমবার প্রত্যাশিত ক্যাডার না পেলেও চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। অবশেষে ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দিয়ে শুরু করেন পেশাগত জীবনের নতুন অধ্যায়।
কর্মজীবনে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও ভারতে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে ইরানের তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে কর্মরত আছেন এই কূটনীতিক।
নিজের লিঙ্গপরিচয় প্রকাশের সিদ্ধান্তও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি, ৩৪ বছর বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পরিচয় প্রকাশ্যে আনেন ওয়ালিদ। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও সামাজিক বিদ্রূপের অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয়েই এ সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর যেমন প্রশংসা পেয়েছেন, তেমনি মোকাবিলা করতে হয়েছে নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যও।
তবে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও চাকরিসংক্রান্ত নথিতে এখনো পুরুষ পরিচয় উল্লেখ রয়েছে। বিসিএসে অংশ নেওয়ার সময় নারী-পুরুষের বাইরে অন্য লিঙ্গপরিচয় জানানোর ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হলেও প্রশাসনিক নথিতে পরিচয় সংক্রান্ত জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি।
কূটনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিও রয়েছে ওয়ালিদের গভীর আগ্রহ। ছবি আঁকা, গান লেখা এবং সংগীত পরিবেশন তাঁর শখের অংশ। তেহরানে নিজের বাসস্থানেও সাজিয়েছেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম, নকশিকাঁথা ও লোকজ হস্তশিল্প দিয়ে। সুন্দর কণ্ঠে বাংলা গান পরিবেশন করে বিদেশি শ্রোতাদের কাছেও তুলে ধরছেন দেশের সংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
ওয়ালিদ ইসলামের এই পথচলা কেবল একজন বিসিএস কর্মকর্তার পেশাগত অর্জনের গল্প নয়। সামাজিক বাধা, ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজের অবস্থান তৈরি করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনসংগ্রাম দেখায়, সুযোগ ও পরিবারের সমর্থন পেলে যোগ্যতা দিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতাই অতিক্রম করা সম্ভব।
সদ্য সংবাদ/এসএস