ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আমজনতার দলের সদস্য সচিব মো. তারেক রহমান। ওই সময়ের তিনটি ঘটনাকে ‘ফাঁদ’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেছেন, এর প্রভাব পরবর্তী সরকারের ওপর পড়তে পারে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার সম্পদ লুটপাটের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
সম্প্রতি রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান।
তারেক রহমানের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কয়েকটি সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল, গ্যাসের তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ বন্ধ এবং দেশে হামের প্রাদুর্ভাব- এই ঘটনাগুলোর বিষয়ে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।
তৃতীয় গ্যাস টার্মিনাল নিয়ে প্রশ্ন
গ্যাসের তৃতীয় টার্মিনাল প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ সামিটকে বাংলাদেশে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সেই উদ্যোগ বাতিল করে।
প্রকল্পটিতে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার পরিমাণ কত ছিল এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করে প্রকল্পটি চালু রাখা সম্ভব ছিল কি না- তা খতিয়ে দেখা হয়নি বলেও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তারেক রহমানের দাবি, নতুন করে একই ধরনের প্রকল্প হাতে নিলে বাস্তবায়নে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। ফলে আগের উদ্যোগ বাতিলের কারণে দেশের জ্বালানি খাতে সময়ের ক্ষতি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।
৩৭ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের প্রসঙ্গ
বিদ্যুৎ খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান দাবি করেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো।
প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সরাসরি বাতিল না করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে সেগুলো বাস্তবায়ন করা যেত কি না- এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তার ভাষ্য, প্রকল্পগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়েও তদন্তের দাবি
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টিও বক্তব্যে তুলে ধরেন তারেক রহমান। সংক্রামক রোগের কারণে শিশুদের মৃত্যু হলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ পরিস্থিতির পেছনে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা বা পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল কি না, তা তদন্ত করার দাবি জানান তিনি। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে থাকলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বানও জানান তিনি।
‘দুই লাখ কোটি টাকার সম্পদের হিসাব দিতে হবে’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও বড় ধরনের অভিযোগ করেন আমজনতার দলের এই নেতা। তার দাবি, ওই সময়ে অন্তত দুই লাখ কোটি টাকার সম্পদ লুটপাট করে তা ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
এই বিপুল অর্থের উৎস, ব্যবহারের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খুঁজে বের করে জনগণের সামনে হিসাব প্রকাশের দাবি জানান তিনি।
বিদেশি কোনো কোম্পানিকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আগে বন্দরের চার্জ ৬০ টাকা থেকে ৪১ টাকা করা হয়ে থাকলে এর পেছনের কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান।
সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জি নিয়েও প্রশ্ন
সামিটের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার বক্তব্য, সামিটের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার পরও বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহের বিদ্যমান লাইন বন্ধ করা হয়নি। তাহলে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ কেন বাতিল করা হলো- এ প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
এ ছাড়া তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক্সিলারেট এনার্জির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রভাব বা স্বার্থ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা দরকার বলে দাবি করেন তিনি।
গ্রামীণফোন ও গ্রামীণ ব্যাংকের সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন
ড. ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়েও তদন্তের দাবি জানান তারেক রহমান।
গ্রামীণফোন, গ্রামীণ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলো কী ধরনের সুবিধা পেয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাংকের কর অব্যাহতি কত বছরের জন্য এবং কী প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছিল, তারও পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রেই যখন অর্থের সংকট রয়েছে, তখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কে কী সুবিধা পেয়েছে, কী প্রক্রিয়ায় পেয়েছে এবং এতে রাষ্ট্রের কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে- এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের পাওনা অর্থ উদ্ধার করারও দাবি জানান তিনি।
সদ্য সংবাদ/এসকে