আফগানিস্তানে তালেবান আবার ক্ষমতায় ফেরার পর মেয়েদের শিক্ষাজীবনে নেমে এসেছে গভীর সংকট। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে আনুমানিক ২৪ লাখ আফগান কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো।
তালেবান সরকারের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে মেয়েদের শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহল। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরত রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, দীর্ঘদিন ধরে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বন্ধ থাকায় এর প্রভাব শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে দেশটির অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও সামাজিক কাঠামোতেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী, নারীদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে ২০৬৬ সালের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ আফগান নারী শ্রমশক্তির বাইরে চলে যেতে পারেন। এতে দেশটির সম্ভাব্য আয় প্রায় ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পর তালেবান দ্রুত দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ক্ষমতায় ফেরার পর তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেছিল, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের অধিকার নিয়ে তাদের নীতি আগের মতো হবে না।
তালেবান সে সময় জানিয়েছিল, ইসলামি আইন ও আফগান সংস্কৃতির কাঠামোর মধ্যে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
২০২২ সালের মার্চে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তালেবান সরকার। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের নিয়মিত স্কুলশিক্ষা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর একই বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীদের পড়াশোনাও নিষিদ্ধ করা হয়। তালেবান কর্তৃপক্ষ এসব নিষেধাজ্ঞাকে বিভিন্ন সময়ে ‘সাময়িক’ হিসেবে উল্লেখ করলেও কয়েক বছর পরও তা প্রত্যাহার করা হয়নি।
শুধু শিক্ষা নয়, আফগান নারীদের কর্মক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে নারীদের কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের অবাধ চলাচলের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধের অভিযোগ রয়েছে।
ফলে একটি প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক মেয়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আফগান সমাজ ও অর্থনীতিতে আরও গভীর হতে পারে।
ইউনেস্কো বলছে, মেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার অর্থ একটি দেশের বিপুল মানবসম্পদকে কাজে লাগানোর সুযোগ হারানো। এতে আফগানিস্তান কয়েক দশক ধরে সম্ভাবনা হারানো, দারিদ্র্য এবং অপূরণীয় ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছে।
তালেবান সরকারের নারী ও মেয়েদের অধিকারসংক্রান্ত নীতির কারণে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়মিত সমালোচনা করে আসছে।
তবে একই সময়ে কিছু দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অন্যান্য সম্পর্কও বাড়িয়েছে। ফলে আফগানিস্তানে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ইউনেস্কোর বক্তব্যের বিষয়ে তালেবান সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের শিক্ষা ও দক্ষতার ওপর। সেই প্রজন্মের অর্ধেককে যদি বছরের পর বছর শিক্ষা থেকে দূরে রাখা হয়, তাহলে এর ক্ষতি শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের নয় পুরো দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও উন্নয়নকেই দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।
সদ্য সংবাদ/এসএস