বিশ্ব রাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিয়ম মানার চেয়ে ক্ষমতা প্রয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের নেতাদের বক্তব্যে এই উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘হিতৈষী শক্তি’ থেকে এককেন্দ্রিক নীতি
নাইন-ইলেভেনের পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে সহমর্মিতা ও সমর্থনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তা অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় মার্শাল প্ল্যানের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে ইউরোপে শান্তি ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশংসিত হলেও, বর্তমানে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। সমালোচকদের মতে, এই নীতি বিশ্ব রাজনীতিতে স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার প্রবণতা জোরদার করছে।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা
দাভোসে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ইঙ্গিত এবং ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি কটাক্ষ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন তোলে। ডেনমার্ক ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর অবদান নিয়ে তার মন্তব্যকে অনেকেই দীর্ঘদিনের মিত্রতার প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে দেখছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই আচরণকে ‘অত্যন্ত অপমানজনক’ বলে আখ্যা দেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের অবস্থান এখন শুধু উন্নয়নশীল দেশ নয়, বরং ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জন্যও চাপের কারণ হয়ে উঠছে।
কার্নির সতর্কবার্তা
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, বিশ্ব এখন কোনো ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নয়, বরং এক ধরনের বড় ‘বিচ্ছেদ’-এর মুখে। তার ভাষায়, শক্তিশালী দেশগুলো যখন নিয়ম ভাঙাকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং বাণিজ্য শুল্ক বা সামরিক শক্তিকে হাতিয়ার বানায়, তখন মধ্যম শক্তির দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আপনি যদি আলোচনার টেবিলে না থাকেন, তবে ধরে নিতে হবে আপনি অন্যের মেনুতে রয়েছেন।”
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
অনেক ইতিহাসবিদ ট্রাম্পের নীতিকে উনিশ শতকের ‘মনরো ডকট্রিন’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থে পুরো অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করত। অতীতে ইরান, গুয়াতেমালা বা পানামায় হস্তক্ষেপের মতো ঘটনাগুলোর সঙ্গে বর্তমানের বাণিজ্য যুদ্ধ ও ভূখণ্ড নিয়ে চাপ প্রয়োগের মিল খুঁজে পাচ্ছেন তারা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিশ্ব আবারও প্রাক-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অস্থিরতার দিকে ফিরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যম শক্তির সামনে করণীয়
বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও দায়বদ্ধ সরকার কোনো স্থায়ী বাস্তবতা নয়—এগুলো রক্ষায় নিরন্তর প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বর্তমান ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য একমাত্র কার্যকর পথ হলো পারস্পরিক ঐক্য জোরদার করা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নতুন কৌশলগত জোট গড়ে তোলা।
সূত্র: বিবিসি