একটি বাসায় একাধিক ব্যক্তি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট গুনছেন—এমন একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পোস্টাল ব্যালটের খামে বাহরাইনের ঠিকানা লেখা রয়েছে।
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের কাছে বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির অভিযোগ, একটি ‘বিশেষ রাজনৈতিক দলের’ নেতারা এসব পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কাজ করছিলেন।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির দৈর্ঘ্য ৭ মিনিট ৩২ সেকেন্ড। সেখানে কয়েকজন ব্যক্তিকে একত্রে পোস্টাল ব্যালট গুনতে দেখা যায়। ভিডিওতে একজনকে ধারণকারীর উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘এই দাঁড়ান, আপনি ভিডিও করছেন কিসের জন্য? এখানে উনারা মেইন ভিডিও করছে। কেন আপনারা আরও ভিডিও করছেন। আপনারা এখান থেকে যেগুলা আছে সব লইয়া যানগা। আমরার দরকার নাই। কিন্তু ভিডিও কইরেন না। ফেসবুকে ছাড়িয়েন না।’ অন্য দিক থেকে আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘ডিস্টার্ব কইরো না, কেউ ফেসবুকে ছাড়বে না।’
পরে ভিডিওতে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘আমরা এগুলো যাচ্ছি আর আনছি না। এগুলো আমাদের দিয়ে গেছে। এখানে আমার দাদিরা ছিল। আপনারা এখানে যা আছে সব লইয়া যানগা।’ একপর্যায়ে একজন মন্তব্য করেন, একাধিক ব্যক্তি ভিডিও করলে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়বে এবং এতে ভাবমূর্তির ক্ষতি হবে। একই সঙ্গে বাহরাইনে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
যাচাই করে দেখা গেছে, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি নয়। এ ছাড়া ২৭ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে একইভাবে বহু পোস্টাল ব্যালট গুনতে দেখা যায়। জুনায়েন বিন সাদ নামের এক ব্যক্তি ভিডিওটি ফেসবুকে শেয়ার করে দাবি করেছেন, এটি ওমানে জামায়াতের এক ব্যক্তির বাসার দৃশ্য। একইভাবে প্রথম ভিডিওটিকেও বাহরাইনে জামায়াতের একজনের বাসার বলে দাবি করছেন কেউ কেউ।
২৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে চট্টগ্রাম–৩ সংসদীয় আসনের নাম উল্লেখ করতে শোনা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম–৩ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তারা রাতেই অবগত হয়েছেন। এটি দেশের বাইরে ধারণ করা হলেও কোন দেশে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এদিকে শনিবার বিকেলে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপির চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে পোস্টাল ব্যালটের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরে বিএনপি।
বৈঠক শেষে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, বাহরাইনে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতারা বহু ব্যালট পেপার ‘হ্যান্ডেল’ করছেন—এমন ভিডিও ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তারা বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
তিনি আরও জানান, নির্বাচন কমিশন আশ্বাস দিয়েছে যে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কেউ ভোটে কারচুপির চেষ্টা করলে তার জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকা ব্লক করা হবে।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, যারা এই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে কারচুপির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও কারাবন্দীদের পাশাপাশি এবারই প্রথম প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আগে আইন থাকলেও এই সুযোগ ছিল সীমিত। এবার ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোটের সুযোগ সম্প্রসারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। এ জন্য নির্বাচনী আইনেও সংশোধন আনা হয়েছে।
৫ জানুয়ারি ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হয়। নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১৫৫ জন ভোটারের পোস্টাল ভোট নিবন্ধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার রয়েছেন ৭ লাখ ৬০ হাজারের কিছু বেশি। বাকি ভোটারদের মধ্যে প্রায় পৌনে ছয় লাখ সরকারি চাকরিজীবী, প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার নির্বাচনী কর্মকর্তা, ১০ হাজার আনসার ও ভিডিপি সদস্য এবং ছয় হাজারের কিছু বেশি কারাবন্দী রয়েছেন।
সূত্র: প্রথম আলো