অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রেফতার হাজারো, মিলছে না জামিন

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৮

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত গুম, ভয়ভীতি ও দমন–পীড়নের সংস্কৃতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেকাংশে কমেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজারো মানুষকে নির্বিচারে আটক করার প্রবণতাও এই সরকারের আমলে দেখা যাচ্ছে। বিচার ছাড়াই আটক থাকা এসব ব্যক্তির জামিন নিয়মিতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ বুধবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন একনায়কতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর মধ্যেই ফেব্রুয়ারি মাসে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউ জানায়, গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর ১৭ নভেম্বর ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘবদ্ধ সহিংসতা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী অধিকার ও এলজিবিটি বিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের যে চর্চা আগের সরকারের আমলে ছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও অব্যাহত রয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করার ঘটনাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা-কর্মী ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে কারাবন্দী রয়েছেন। এ তালিকায় অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও আছেন।

গত বছর শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানে অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আরও অনেককে আটক করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির এক সমাবেশকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাহিনী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। পরে কয়েক শ আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করা হয় এবং ৮ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। সরকার অবশ্য গণগ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর এক প্রতিবেদনের বরাতে এইচআরডব্লিউ জানায়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনের শিকার বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৮ হাজার মানুষ আহত এবং ৮১ জন নিহত হয়েছেন।

মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধিত ধারার আওতায় গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়, যার ফলে দলটির সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা ও অনলাইন বক্তব্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগই রাজনৈতিক কর্মী ও উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা সংঘটিত।

সাইবার নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় অযৌক্তিক বাধা সৃষ্টি করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার গত মার্চে আইনের কয়েকটি ধারা বাতিল করেছে, তবুও কিছু বিধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিগত সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার প্রসঙ্গে এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে দায়ীদের জবাবদিহির ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রগতি সীমিত।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মান ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। যদিও কিছু আইন সংশোধন করা হয়েছে, তবুও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা এবং রাজনৈতিক সংগঠন বিলুপ্ত করার ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগ আমলের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার তদন্তে গঠিত কমিশন এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৫০টির বেশি অভিযোগ পেয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করা ও সহযোগিতার অভাব তদন্তে বাধা সৃষ্টি করছে।

প্রতিবেদনের শেষাংশে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে সেগুলোর বাস্তবায়ন ধীরগতির। নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থীর আগমন এবং বৈদেশিক সহায়তা হ্রাসের ফলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে সরকার কি উদ্যোগ নিয়েছে- জানতে চাইল সংসদীয় কমিটি সদ্য. বজ্রপাতে তিন জেলায় ৪ জনের মৃত্যু সদ্য. ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৮ হাজার সদ্য. আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বেনামি গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে দেশ অস্থিতিশীলের চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী সদ্য. সন্ধ্যার মধ্যে ৪ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস, বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা সদ্য. অনুষ্ঠানের স্ক্রিনে ভেসে উঠল দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ছবি, দুই শিক্ষককে শোকজ সদ্য. ইউএনও থেকে সচিব হলেন সাইফুল ইসলাম জয় সদ্য. অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি ক্লোজড সদ্য. ভারতে পলাতক আসামিরা যেন অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারে সদ্য. শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে সরকার কি উদ্যোগ নিয়েছে- জানতে চাইল সংসদীয় কমিটি সদ্য. বজ্রপাতে তিন জেলায় ৪ জনের মৃত্যু সদ্য. ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৮ হাজার সদ্য. আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বেনামি গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে দেশ অস্থিতিশীলের চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী সদ্য. সন্ধ্যার মধ্যে ৪ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস, বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা সদ্য. অনুষ্ঠানের স্ক্রিনে ভেসে উঠল দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার ছবি, দুই শিক্ষককে শোকজ সদ্য. ইউএনও থেকে সচিব হলেন সাইফুল ইসলাম জয় সদ্য. অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি ক্লোজড সদ্য. ভারতে পলাতক আসামিরা যেন অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারে