ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার এখন পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নেওয়া উদ্যোগ, অগ্রগতি এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিটির কাছে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটিকে জানানো হয়েছে, বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠাতে ভারতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও তাগাদা অব্যাহত রয়েছে।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সরকারের অন্যতম এজেন্ডা। এ বিষয়ে বৈঠকে উপস্থিত দুই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত কী কী উদ্যোগ নিয়েছে এবং এসবের অগ্রগতি কী, তার একটি প্রতিবেদন কমিটিতে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ প্রক্রিয়ায় সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, সেটিও জানাতে বলা হয়েছে।
জহরত আদিব চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (২) শামা ওবায়েদ ইসলাম, আমানউল্লাহ আমান, এস কে আজিজুল বারী, এ বি এম মোশাররফ হোসেন ও সানজিদা ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ আমন্ত্রণে বৈঠকে যোগ দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (১) হুমায়ুন কবির।
বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে মন্ত্রণালয় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে কমিটিকে অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া শরিফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দেশে ফেরানোর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানো হয়।
শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি বৈঠকে উত্থাপন করেন কমিটির সদস্য এস কে আজিজুল বারী হেলাল ও এ বি এম মোশাররফ হোসেন। জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, সরকার তাঁকে অবশ্যই ফেরত চাইবে। তবে এর সঙ্গে কোনো শর্ত বা বিনিময়ের বিষয় থাকবে না; তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতেই হবে।
পরে এ বি এম মোশাররফ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছিল। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে ফেরানোর জন্য ভারতকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো গাফিলতি নেই বলেও তাঁকে জানানো হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বৈঠকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরার কথা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনগত উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। ভারতের প্রকাশ্য অবস্থানও হলো, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধটি সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গেও যোগাযোগ করার পরিকল্পনার কথা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগামী অক্টোবরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবে সংসদীয় কমিটি। সেখানে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হবে। এতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি এবং জনপ্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে জহরত আদিব চৌধুরী বলেন, ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সংসদ সদস্যরা অংশ নেন। এসব আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে রাষ্ট্রের অবস্থান তুলে ধরা হবে।
এ বি এম মোশাররফ হোসেন জানান, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচনায় বলা হয়, বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব থাকবে, তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বৈঠকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতীতে বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতিগত দুর্বলতা ছিল। যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতির কারণে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে বিদেশগামী কর্মীদের তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে সত্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। যাচাই করা ও উপযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থাও জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত এবং প্রবাসী কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো মাইগ্রেশন উইং চালুর বিষয়টিও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি দালাল ও অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণা থেকে সম্ভাব্য অভিবাসনপ্রত্যাশীদের রক্ষায় তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে সামাজিক সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সদ্য সংবাদ/ এআর