রাত তখন গভীর। গ্রামের একটি বাড়িতে প্রসবব্যথায় কাতর এক নারী। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন, কিন্তু পরিবারের কারও কাছে অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর নেই। আশপাশে খোঁজ করেও মিলছিল না প্রয়োজনীয় যোগাযোগ। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে বাড়িতেই সন্তান প্রসব করেন ওই নারী। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। সুস্থ হতে সময় লাগে বেশ কিছুদিন।
ঘটনাটি কাছ থেকে দেখেছিলেন ফেনীর তরুণ এম এইচ অনিক। সেই ঘটনা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। জরুরি মুহূর্তে মানুষ যদি প্রয়োজনীয় একটি ফোন নম্বর বা সেবার তথ্য সহজেই পেত, তাহলে হয়তো অনেক ভোগান্তি কমানো সম্ভব হতো।
শুধু এই একটি ঘটনা নয়, ফেনীতে জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজতে গিয়ে মানুষের বিড়ম্বনা, গভীর রাতে চিকিৎসকের সন্ধান না পাওয়া, অ্যাম্বুলেন্স বা পুলিশের নম্বর খুঁজতে সময় চলে যাওয়া এ ধরনের নানা সমস্যার কথা ভাবতেন অনিক। সেখান থেকেই তাঁর মাথায় আসে একটি স্থানীয় সেবা অ্যাপ তৈরির ভাবনা।
সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে ‘Amar Feni’ (আমার ফেনী) নামের একটি জেলা–ভিত্তিক সেবা অ্যাপ। ফেনী জেলার মানুষের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন তথ্য ও জরুরি সেবার যোগাযোগ এক জায়গায় সহজে পৌঁছে দেওয়াই এই অ্যাপের লক্ষ্য।
জরুরি সময়ে এক জায়গায় প্রয়োজনীয় তথ্য
‘আমার ফেনী’ অ্যাপে রয়েছে রক্তদাতা, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন জরুরি সেবার তথ্য। পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসক ও হাসপাতালের তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বর ও স্থানীয় যোগাযোগের তথ্য।
জরুরি মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে রক্তের ব্যবস্থা। তাই অ্যাপটিতে রক্তদাতা খোঁজার সুবিধাও রাখা হয়েছে। প্রয়োজনের সময় রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী সম্ভাব্য রক্তদাতার তথ্য খুঁজে পাওয়ার সুযোগ থাকছে এতে।
এর বাইরে ফেনী জেলার ইউনিয়ন ও স্থানীয় এলাকার তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু জরুরি সেবা নয়, স্থানীয় প্রয়োজনীয় তথ্যও একটি প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়েছে।
শৈশবের স্বপ্ন থেকে অ্যাপ
অ্যাপটির নির্মাতা এম এইচ অনিক ফেনী সদর উপজেলার বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু শেখা এবং প্রযুক্তির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে তাঁকে সফটওয়্যার ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের দিকে নিয়ে যায়।
অনিকের ভাবনা ছিল, প্রযুক্তি শুধু বিনোদন বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য নয় নিজ এলাকার মানুষের সমস্যার সমাধানেও ব্যবহার করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই নিজের জেলার মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

অনিক বলেন, মানুষের উপকারে আসে এমন কিছু তৈরি করার ইচ্ছা থেকেই ‘আমার ফেনী’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেক জটিলতা সহজ করা সম্ভব।
রক্তদাতা খোঁজা থেকে হাসপাতালের তথ্য
জরুরি প্রয়োজনে রক্তের জন্য একজন মানুষের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে ছুটে বেড়ানোর ঘটনা নতুন নয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় কিংবা দূরের এলাকায় রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। অনিক মনে করেন, প্রয়োজনীয় তথ্য যদি হাতের মুঠোয় থাকে, তাহলে অন্তত খোঁজার সময়টা কমানো সম্ভব।
একইভাবে গভীর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কাছাকাছি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের যোগাযোগ নম্বর খুঁজতে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন হলেও কোথায় ফোন করতে হবে, তা জানা থাকে না অনেকের। এসব বাস্তব সমস্যাকে সামনে রেখেই অ্যাপটিতে বিভিন্ন সেবার তথ্য যুক্ত করা হয়েছে।
ফেনীর মানুষের জন্যই ‘আমার ফেনী’
‘আমার ফেনী’কে শুধু একটি অ্যাপ হিসেবে নয়, ফেনী জেলার মানুষের জন্য একটি স্থানীয় তথ্যভান্ডার হিসেবে গড়ে তুলতে চান এর নির্মাতা। তাঁর লক্ষ্য হলো—জেলার বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবাকে ধীরে ধীরে একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা।
অ্যাপটির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা জরুরি সেবা, চিকিৎসা, রক্তদাতা, হাসপাতাল, স্থানীয় এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের তথ্য সহজে খুঁজে পাবেন। আর এসব তথ্য মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়াই উদ্যোগটির মূল উদ্দেশ্য।
প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা অনেক তরুণ যেখানে বড় বাজার বা বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবছেন, সেখানে অনিকের উদ্যোগের শুরুটা নিজের জেলা থেকে। তাঁর স্বপ্ন, ফেনীর একজন মানুষ যেন জরুরি মুহূর্তে প্রয়োজনীয় একটি তথ্যের জন্য অসহায় হয়ে ঘুরে না বেড়ান।
ছোট একটি স্বপ্ন থেকেই শুরু। কিন্তু সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছে নিজের এলাকার মানুষের প্রয়োজন। আর সেই জায়গা থেকেই ‘আমার ফেনী’ হয়ে উঠতে পারে ফেনীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি প্রয়োজনীয় ডিজিটাল সহায়ক।
‘আমার ফেনী’ অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোরে বিনা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। ফেনীর যেকোনো প্রান্তের মানুষ সহজেই অ্যাপটি ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবেন।
সদ্য সংবাদ/এসএস