জমির ক্রমবর্ধমান দামের কারণে আবাসন খাতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শেয়ারভিত্তিক বিনিয়োগ। তুলনামূলক কম অর্থে ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার আশায় এ ধরনের প্রকল্পে টাকা বিনিয়োগ করছেন অনেক মানুষ। তবে জমির মালিকানা নিশ্চিত না হওয়া, অনুমোদনহীন প্রকল্প এবং একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির মতো অভিযোগে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ পড়েছেন বিপাকে। দেশজুড়ে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ৯ হাজার ৮০০টির বেশি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।
আদালত ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (টিবিএস) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আবাসন খাতের এ চিত্র। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে সাধারণত জমির একটি অংশের বিপরীতে নির্দিষ্ট অর্থ বিনিয়োগ করেন ক্রেতারা। বিনিময়ে চুক্তি অনুযায়ী জমির মালিকানা কিংবা ভবিষ্যতে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান জমির বৈধ মালিকানা নিশ্চিত না করেই বিনিয়োগ সংগ্রহ করছে। কোথাও অনুমোদনহীন নকশা দেখিয়ে অর্থ নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও একই জমির শেয়ার একাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে এমন প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকায় ১১টি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৪৭০ গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষে মামলা করেছে। গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হায়দার কবির মিথুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি এখনও কারাগারে রয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির উত্তরখান প্রকল্পে বিনিয়োগ করা আসাদুল ইসলাম রুমনের অভিজ্ঞতাও উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১৫ লাখ টাকায় একটি শেয়ার কেনার চুক্তি করেন তিনি। চুক্তিতে ১ হাজার ২২০ বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের সুযোগের কথা বলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে ৩৬ জন ক্রেতাই তাঁদের নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে রুমন জানতে পারেন, একই জমির শেয়ার আরও ৪০ জনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, জমির মালিকানা নিবন্ধন করে দেওয়ার বদলে প্রতিষ্ঠানটি নানা অজুহাত দেখাতে থাকে। পরে জমিটি ভাড়া নেওয়া ছিল বলেও জানতে পারেন তিনি। প্রকল্পটির অনুমোদনের বিষয়ে তাঁকে রাজউকের একটি ভুয়া নকশা দেখানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন এই বিনিয়োগকারী।
টিবিএসের প্রতিবেদনে সিআইডির সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়েছে, হলিস্টিক হোম বিল্ডার্সের সাতটি প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছেন ৪৭০ জন গ্রাহক। ২০২০ সাল থেকে এসব প্রকল্পে বিনিয়োগকারীরা প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটির উত্তরার কার্যালয়ে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
শুধু রাজধানী নয়, সিলেটেও শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। ‘স্বপ্ন ছায়া আবাসন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারি খাসজমিতে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার কথা বলে ১৫০ গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৯০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সিলেটের লামাবাজার এলাকায় ৪০ কাঠা জমিতে ১০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছিল বলে অভিযোগ। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিনিয়োগকারীদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, প্রত্যেকে ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট নির্মাণের সুযোগ পাবেন।
প্রকল্পটিতে বিনিয়োগকারী বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মহসিন হোসেইনের অভিযোগ, সব শেয়ার বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর জমি নিবন্ধনের বিষয়ে যোগাযোগ করলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম খায়রুল ইসলাম নানা টালবাহানা শুরু করেন। পরে জমিটি সরকারি খাসজমি বলে জানতে পারেন তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তুলেছেন মহসিন। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অর্থ নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে গেছেন।
সিলেট অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট গ্রুপের (সারেগ) চেয়ারম্যান মাওলানা খায়রুল হোসেন জানিয়েছেন, জমির শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণার অর্ধশতাধিক অভিযোগ তাঁদের কার্যালয়ে জমা পড়েছে। তবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠনটির সদস্য না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
টিবিএসের অনুসন্ধানে রাজধানীতে জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার ২০টি ঘটনা উঠে এসেছে। এর মধ্যে ১৬টি ঘটনায় আবাসন কোম্পানি হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রতিষ্ঠান জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফতাবনগরের ‘শেয়ার ল্যান্ড বিল্ড হোম’ নামের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, মেরুল বাড্ডার ‘আমার বাড়ি আমার ঘর’ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জমির শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ৬৫ জন ব্যক্তি মামলা করেছেন।
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে কেন্দ্র করেও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিপুলসংখ্যক আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। মুন্সীগঞ্জ জেলা আদালতের তথ্য অনুযায়ী, জমির শেয়ার বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগে সেখানে প্রায় ৫৩৮টি মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ২৮৬টি ঘটনায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা আবাসন প্রকল্পের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আব্দুল আজিজ বলেন, কেরানীগঞ্জ, লৌহজং ও সিরাজদিখান এলাকায় এ ধরনের মামলা বেশি। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে ঘিরে নতুন আবাসন প্রকল্পের চাহিদা তৈরি হওয়ায় কিছু প্রতারক চক্র সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্য।
সুপ্রিম কোর্টের সূত্রের বরাতে টিবিএস জানিয়েছে, সারা দেশে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮২৩টি মামলার মধ্যে ঢাকা মহানগর ও জেলা জজ আদালতেই রয়েছে ৫ হাজার ৯৪৮টি। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের আদালতগুলোতে ২৮৬টি মামলায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা জজ আদালতে ৩৮৬টি মামলায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা জড়িত। সিলেট মহানগর ও জেলা জজ আদালতে বিচারাধীন ২১৩টি মামলায় অর্থের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। দেশের আরও কয়েকটি জেলাতেও এ ধরনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা রয়েছে।
রিহ্যাবের সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৯ ও ২০ ধারায় নিবন্ধন ছাড়া আবাসন ব্যবসা এবং অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প পরিচালনা বা বিক্রির ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। চুক্তিবদ্ধ সম্পত্তি ক্রেতার অজ্ঞাতে অন্যত্র বিক্রি করলে আইনের ২৪ ধারায় শাস্তির সুযোগ রয়েছে। কোম্পানির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে ৩১ ধারায় দায়ী মালিক, পরিচালক বা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায়ের বিষয়টিও বিবেচনায় আসে।
কামাল মাহমুদ বলেন, প্রতারণার ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করা গেলেও আবাসন খাতের অনিয়ম তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে প্রতারক চক্রের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও করেন তিনি।
তবে রিহ্যাব সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল বলেন, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সংগঠনটির সদস্য না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর মতে, বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রিহ্যাব সদস্যপদ, প্রকল্পের রাজউক অনুমোদন এবং জমির মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ভাড়া নেওয়া জমি, অনুমোদনহীন বা ভুয়া নকশা, জাল দলিল এবং ভুয়া নামজারির কাগজপত্র ব্যবহার করে কিছু প্রকল্পে ক্রেতাদের প্রতারিত করার অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম ঠেকাতে রাজউক ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ও মুখপাত্র মো. শাহীনুর আলম জানিয়েছেন, অনুমোদনহীন আবাসন প্রকল্প বন্ধ ও উচ্ছেদে রাজউক নিয়মিত অভিযান চালায়। গত কয়েক মাসে জমির শেয়ার বিক্রির নামে পরিচালিত বেশ কয়েকটি অবৈধ প্রকল্প বন্ধ করা হয়েছে। নতুন অভিযোগ পাওয়া গেলে আরও জোরালো ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসনে বিনিয়োগের আগে জমির প্রকৃত মালিকানা, নিবন্ধনযোগ্যতা, প্রকল্পের অনুমোদন এবং চুক্তির শর্ত যাচাই করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও কম টাকায় ফ্ল্যাট পাওয়ার প্রতিশ্রুতির আড়ালে বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে যার প্রতিফলন মিলছে দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন হাজার হাজার মামলায়।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
সদ্য সংবাদ/এসএস