সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও বাবা-মায়ের আজীবন ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় সংসদে আপত্তি জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। প্রস্তাবিত বিধান কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে দাবি করে বিলটি চলতি অধিবেশনে পাস না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬- এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত আইনের কিছু বিষয় ইসলামী উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিলটি সরাসরি পাস না করে শরিয়াহ আইনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তাদের সুপারিশ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনের সূরা নিসার ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকার বণ্টন ও এর পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। যারা আল্লাহর দেওয়া বিধানে বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে প্রস্তাবিত আইনের প্রয়োগ কীভাবে গ্রহণযোগ্য হবে- এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
উইল ও হেবার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, জীবদ্দশায় কাউকে হেবা বা দান করা হলে তাকে সম্পত্তির মালিকানা ভোগের সুযোগ দিতে হয়। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার বিষয়টি হেবা নয়, বরং ওসিয়তের আওতাভুক্ত। আর ওসিয়তের ক্ষেত্রেও ইসলামী বিধানে নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনে এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় না থাকায় শরিয়াহর মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো ফকিহ নই, মুফতিও নই; আপনাদের মতোই কোরআনের একজন অতি সাধারণ ছাত্র।’
শফিকুর রহমান আরও বলেন, বিষয়টি মানুষের ঈমান ও আকিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ ধরনের আইন যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া পাস করা হলে সমাজে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি প্রকৃত হকদারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্তানদের হাতে সম্পত্তি তুলে দেওয়ার পর অনেক বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা সমাজে দেখা যায়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় পিতা-মাতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিলটি চলতি অধিবেশনে পাস না করে শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিলে তা জাতির জন্য কল্যাণকর হবে। এ প্রক্রিয়ায় ইসলামী ফাউন্ডেশনকে যুক্ত করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ইসলামী ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট আলেম ও স্কলারদের নিয়ে বিষয়টি পরীক্ষা করে তাদের মতামত সংসদের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। স্থায়ী কমিটি এ সুযোগ গ্রহণ করলে সম্ভাব্য জটিলতা এড়ানোর পাশাপাশি আল্লাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, বিলটির বিরোধিতা করে সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মোমেন বলেন, দেশের প্রখ্যাত আলেমরা প্রস্তাবিত আইনের আজীবন ভোগদখলের বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এ বিধানের মাধ্যমে ইসলামী উত্তরাধিকার বা মিরাসের বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ব্রিটিশ আমলের আইন প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্টেও মুসলমানদের উত্তরাধিকার, হেবা, বিবাহসহ পারিবারিক বিষয় শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালনার বিষয়টি স্বীকৃত ছিল।
তবে সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সামাজিক বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেন নজিবুর রহমান। তিনি বলেন, এ ধরনের সমস্যা সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামী পারিবারিক আইনকে পাশ কাটানোর কোনো যুক্তি নেই।
বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষায় ২০১৩ সালে আইন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই আইনের মাধ্যমেই পিতা-মাতার অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
সদ্য সংবাদ/এসকে