প্রতিটি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে উঠে আসে উন্নয়ন, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি। ভোটাররা সেই আশায় ভোট দেন, সরকার গঠন করেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে বাস্তবতার চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো দুর্নীতি ও অর্থ পাচার। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য। এই অর্থ যদি দেশে বিনিয়োগ হতো, তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারত।
দুর্নীতির অভিযোগ কেবল প্রশাসনিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। অনেক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, ব্যাংক খাত লুট এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অথচ এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার খুব কম ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান।
সাধারণ ভোটারদের অভিযোগ, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কমে যায়। ভোটের সময় যাদের ঘরে ঘরে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, নির্বাচনের পর তারা অনেক সময় অধরাই থেকে যান। ফলে গণতন্ত্র ভোটকেন্দ্র পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, জীবনের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন ঘটছে না।
অন্যদিকে, অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি যে চাপে পড়ছে, তার বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও সামাজিক বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার পেছনে এই অনিয়মগুলো বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন যদি কেবল ক্ষমতা বদলের একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, তবে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। প্রয়োজন নির্বাচনের পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাস্তব ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ১২টি নির্বাচন—এই সংখ্যা ইতিহাসে লেখা থাকবে। কিন্তু ইতিহাসে সাধারণ ভোটারদের প্রাপ্তির হিসাব কীভাবে লেখা হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যাঁরা বিজয়ী হবেন এবং যে সরকার গঠিত হবে, তারা কি পারবেন বিগত ১২টি জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ জনগণের অপূর্ণ থেকে যাওয়া প্রত্যাশা ও আক্ষেপগুলো পূরণ করতে?
দীর্ঘদিন ধরে ভোটাররা সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা, ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার যে স্বপ্ন দেখে আসছেন, তার কতটা বাস্তবায়ন হবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচন শেষে ক্ষমতার পালাবদল হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অনেক সময় দৃশ্যমান হয়নি।
দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি—এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠা না গেলে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষকরা। তাই আসন্ন নির্বাচন শুধু আরেকটি ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নাকি সত্যিকার অর্থে জনগণের স্বার্থ রক্ষার নতুন সূচনা—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কি পারবে অতীতের ব্যর্থতার গ্লানি মুছে নতুন আশার বার্তা দিতে? নাকি জনগণের না পাওয়া আক্ষেপগুলো আরও একবার প্রশ্ন হয়েই থেকে যাবে—সেই উত্তরই দেবে সময়।