‘ডাইনি বাহিনী’র হানিট্র্যাপে কুপোকাত রুশ সেনারা

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:৩৩
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখন আর শুধু সম্মুখসমরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে প্রতিরোধ আন্দোলন ক্রমেই আরও গোপন, প্রযুক্তিনির্ভর ও সংগঠিত রূপ নিয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে প্রকাশ্য প্রতিবাদ, প্রতীকী প্রতিরোধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলেও বর্তমানে সেই প্রতিরোধ অনেকটাই ছায়াযুদ্ধের রূপ নিয়েছে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে বহুল আলোচিত একটি দৃশ্যে এক ইউক্রেনীয় বৃদ্ধাকে রুশ প্যারাট্রুপারের হাতে সূর্যমুখীর বীজ তুলে দিতে দেখা যায়। তিনি বলেছিলেন, মৃত্যুর পর ওই মাটিতে সূর্যমুখী ফুটবে। সেই দৃশ্য একসময় ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে প্রতিরোধের কৌশলও বদলে গেছে।

দখলকৃত অঞ্চলে অবস্থানরত এক রুশ সেনা কয়েক মাস ধরে বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি অনলাইনে এক ইউক্রেনীয় নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়েছেন। ব্যক্তিগত নানা বিষয়ে নিয়মিত কথোপকথনের মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে ওই নারী তার অবস্থানের একটি ছবি পাঠাতে অনুরোধ করেন। সেনাটি ছবি পাঠানোর পর তার পেছনে থাকা অস্পষ্ট মানচিত্র বিশ্লেষণ করে অবস্থান শনাক্ত করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে ড্রোন হামলা চালানো হয়।

পরে জানা যায়, ওই নারী বাস্তবে অস্তিত্বহীন। তিনি ছিলেন ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর এক সদস্য, যিনি ছদ্মবেশে এই অভিযান পরিচালনা করছিলেন। দ্য আটলান্টিকের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ আন্দোলনে বর্তমানে একটি শব্দ বারবার আলোচনায় আসছে—‘বিদমা’। লোককথায় এর অর্থ ‘ডাইনি’ বা জাদুকরী নারী। তবে প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটি এমন নারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও স্থানীয় বাস্তবতার গভীর জ্ঞান রয়েছে।

দখলকৃত অঞ্চলে অনেক নারী প্রতিদিন রুশ চৌকি অতিক্রম করে হাসপাতাল, স্কুল ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছেন। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন। কোথায় কার অবস্থান, কোন স্থাপনা কী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে—এসব তথ্য প্রতিরোধ নেটওয়ার্কের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তারা।

ইউক্রেনের সাবেক সংসদ সদস্য লেসিয়া ওরোবেটস বলেন, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কারণে একসময় নিপীড়নের শিকার হওয়া এসব নারী এখন প্রতিরোধ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

মারিউপোল থেকে পালিয়ে আসা প্রতিরোধ কমান্ডার পেত্রো অ্যান্ড্রিউশচেঙ্কোর ভাষ্য, নারীরা এমন অনেক জায়গায় পৌঁছাতে পারেন যেখানে পুরুষদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে তারা আরও সাহসী ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন।

খেরসনের বাসিন্দা রক্সানা নামে এক নারী যুদ্ধ শুরুর আগে একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন। রুশ বাহিনী এলাকা দখলের পর সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। পালানোর পথে তাকে ৩৩টি রুশ চৌকি অতিক্রম করতে হয়। তার দাবি, পথে তিনি বহু মরদেহ দেখেছেন, যাদের মধ্যে নারীদের ওপর সহিংসতার চিহ্নও ছিল।

বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করে তিনি ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের জন্য লক্ষ্যবস্তু যাচাইয়ের কাজ করছেন। স্থানীয় অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে তিনি নির্ধারণ করেন কোনো স্থাপনা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।

এদিকে ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সেরহির নেতৃত্বে পরিচালিত একটি নেটওয়ার্ক রুশ সেনাদের অনলাইনে সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে তথ্য সংগ্রহ করছে। এই কৌশল ‘হানিট্র্যাপ’ নামে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহারের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের নিয়ে কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

ইউক্রেনের ৪২৬তম চালকবিহীন ব্যবস্থা রেজিমেন্টের এক কমান্ডার জানান, দখলকৃত অঞ্চলে প্রায় প্রতি রাতেই ড্রোন অভিযান পরিচালিত হয়। প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এসব হামলা চালানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়ার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই হামলা সংঘটিত হয়।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক সময় তথ্যদাতা তখনও সংশ্লিষ্ট রুশ সেনার সঙ্গে অনলাইনে কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ই হামলা সংঘটিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিরোধ কৌশলের লক্ষ্য শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো নয়; বরং রুশ সেনাদের মধ্যে স্থায়ী ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা। যাতে তারা দখলকৃত এলাকার প্রতিটি সাধারণ মানুষকে সম্ভাব্য প্রতিরোধযোদ্ধা হিসেবে দেখতে বাধ্য হয়।

ইউক্রেনের এক অপারেটিভ, যিনি ‘সেস্ত্রা’ নামে পরিচিত, বলেন তিনি চান রুশ সেনারা সবসময় আতঙ্কে থাকুক। কারণ তারা কখনো নিশ্চিত হতে পারবে না, কে তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ ধীরে ধীরে নতুন ধরনের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। এখানে শুধু অস্ত্র নয়, তথ্য, মনস্তত্ত্ব, পরিচয় গোপন রাখা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে নারীরা কখনো তথ্যসংগ্রাহক, কখনো বিশ্লেষক, আবার কখনো প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. আওয়ামী লীগের অপতৎপরতায় সরকার মোটেও শঙ্কিত নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আবারও আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত সদ্য. নতুন ২ বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন, উৎপাদন হবে ২৬৪০ মেগাওয়াট সদ্য. পল্লবীতে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিমের বাবাকে ফোন করে সমবেদনা জানালেন জামায়াত আমির সদ্য. অপ্রতিম হত্যায় ৪ জন গ্রেপ্তার, স্বীকারোক্তি মিলেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধে ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ সদ্য. ভারতের কাছে ১১৪ রানে হেরে গেল বাংলাদেশ সদ্য. জাফর ইকবাল ও মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি সদ্য. আওয়ামী লীগের অপতৎপরতায় সরকার মোটেও শঙ্কিত নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে আবারও আলোচনায় ঢাকা-দিল্লি সদ্য. প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত সদ্য. নতুন ২ বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন, উৎপাদন হবে ২৬৪০ মেগাওয়াট সদ্য. পল্লবীতে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে আগুন সদ্য. অপ্রতিমের বাবাকে ফোন করে সমবেদনা জানালেন জামায়াত আমির সদ্য. অপ্রতিম হত্যায় ৪ জন গ্রেপ্তার, স্বীকারোক্তি মিলেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সদ্য. মানবতাবিরোধী অপরাধে ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ সদ্য. ভারতের কাছে ১১৪ রানে হেরে গেল বাংলাদেশ সদ্য. জাফর ইকবাল ও মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি