মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর আলমের নামে নোয়াখালীর সদর উপজেলা ও চাটখিল উপজেলায় মোট ৩৫ শতাংশ জমি জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪০ টাকা। পাশাপাশি ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত ১ হাজার ৩৮৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট জব্দ করতে বলা হয়েছে, যার মূল্য ৪১ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
এছাড়া, তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে থাকা সাতটি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এসব হিসাবে মোট ১ কোটি ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৯ টাকা জমা রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল এসব সম্পদ জব্দ ও হিসাব অবরুদ্ধের আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত ও মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার নামে থাকা সম্পদ জব্দ করা জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, কামরুন নাহারের বিরুদ্ধে ছয় কোটি ৮০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার নামে খোলা সাতটি সঞ্চয়ী ও ডিপিএস হিসাবে প্রায় পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় দুদক পৃথক মামলা করেছে। এ কারণে এসব হিসাব অবরুদ্ধ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে বলা হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা তার বাসায় কর্মরত এক পিয়নের বিপুল সম্পদের কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করেন।
জাহাঙ্গীর আলম টানা দুই মেয়াদে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময়ও তিনি তার ব্যক্তিগত স্টাফ হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাসা থেকে খাবার ও পানি বহনের দায়িত্বে থাকায় তিনি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিতি পান। পরে নানা অভিযোগের মুখে তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম একসময় চাটখিল উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় ব্যবহার করে তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হন। এ অবস্থায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের ঘোষণা দেয় দুদক। মামলার আগে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি একসময় জাতীয় সংসদে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন এবং একটি নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসেন। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তার সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে।
সবশেষ, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ (চাটখিল–সোনাইমুড়ী) আসনে প্রার্থী হতে জমা দেওয়া হলফনামায় জাহাঙ্গীর আলম নিজের নামে প্রায় ২১ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য দেন। একই সঙ্গে তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে দেখানো হয় ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদ।
এর আগে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি আদালত জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী কামরুন নাহারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।