ইরানে খামেনির পতন কি আসন্ন?

A
Admin
২৫ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭:২৭
ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন এক নতুন ও নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রায় পাঁচ দশকের ইতিহাসে এমন ব্যাপক, বিস্তৃত ও ধারাবাহিক বিক্ষোভ আগে দেখা যায়নি। দেশজুড়ে শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মানুষ রাস্তায় নেমে আসছে।

এর জবাবে ইরানি কর্তৃপক্ষ দমন-পীড়ন চালালেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এবারের আন্দোলন কি আগের সব আন্দোলন থেকে আলাদা? আর সত্যিই কি ইরান সরকারের পতন ঘনিয়ে আসছে?

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যাপকতা ও তীব্রতা।

সমাজবিজ্ঞানী এলি খোরসান্দফার বলেন, 'বড় শহরের পাশাপাশি ছোট ছোট শহরেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলোর নাম অনেকেই আগে শোনেনি।'

এর আগে ইরান একাধিক বড় আন্দোলন দেখেছে। ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট ছিল মূলত মধ্যবিত্তদের নেতৃত্বে এবং বড় শহরকেন্দ্রিক। ২০১৭ ও ২০১৯ সালের বিক্ষোভ গড়ে উঠেছিল দরিদ্র ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে। ২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে আন্দোলন নারীর অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।

তবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বর্তমান আন্দোলন আগের সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ প্রতিদিনই নতুন মাত্রা পাচ্ছে এবং এর গতি থামার কোনো লক্ষণ নেই। এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে। ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের ভয়াবহ দরপতনের প্রতিবাদে তেহরানের বাজারগুলোতে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চলে।

এরপর আন্দোলনে যোগ দেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে লাগামহীন দ্রব্যমূল্য ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। ধীরে ধীরে আন্দোলনের স্লোগান বদলে যায়—‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’। সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি ও তার সরকারের অপসারণের দাবি ওঠে রাজপথে।

২০২২ সালের আন্দোলনে দৃশ্যমান কোনো নেতৃত্ব না থাকায় সেটি দ্রুত স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। এবারের আন্দোলনে সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নির্বাসনে থাকা ইরানের সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, পাহলভির প্রতি যে সমর্থনের আভাস দেখা যাচ্ছে, তা রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা নয়। বরং এটি ইসলামী শাসনের বিকল্প কোনো স্পষ্ট নেতৃত্ব না পাওয়ার হতাশার প্রতিফলন। পরিচিত বিরোধী মুখগুলোর উপস্থিতি বিক্ষোভকারীদের মনে এই ধারণা দিচ্ছে যে, সরকার পতনের পরও একটি বিকল্প কাঠামো থাকতে পারে।

এবারের আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সমর্থন। ট্রাম্পের হুমকি ও বক্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। অতীতে ২০০৯ সালের আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন সরাসরি অবস্থান নেয়নি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দাবি করেছেন, এই বিক্ষোভ বিদেশি শক্তির মদদে পরিচালিত। তবে বাস্তবতা হলো, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরানের মিত্র এখন আগের চেয়ে অনেক কম।

সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতন, লেবাননে হেজবুল্লাহর দুর্বল হয়ে পড়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ, সব মিলিয়ে ইরানের প্রভাব ও আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা লেগেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ভাবমূর্তি জনগণের চোখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সরকারের প্রতি ভয় ও আনুগত্য দুটোই কমেছে। বিশেষ করে নারীদের ভূমিকা এবারের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ।

খোরসান্দফার বলছেন, আন্দোলনে নারীদের রাস্তায় আসা এবং দমনমূলক শাসনের ভয় কাটিয়ে ওঠাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সব মিলিয়ে ইরান এখন এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে দাঁড়িয়ে। সরকার দমন-পীড়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে, নাকি এই আন্দোলনই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের চূড়ান্ত, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: এবারের বিক্ষোভ ইরানের রাজনীতিতে এমন এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, যার উত্তর সময়ই দেবে, ইরান সরকার টিকে থাকবে, নাকি পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা?

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

শিরোনাম:
সদ্য. জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবিতে হেফাজতে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিব সদ্য. সারাদেশে একযোগে ৯৯ বিচারককে বদলি সদ্য. শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে সরকার কি উদ্যোগ নিয়েছে- জানতে চাইল সংসদীয় কমিটি সদ্য. আগামী মাস থেকে বাংলা কিউআরে সঙ্গে সঙ্গেই টাকা পাবেন বিক্রেতা সদ্য. বজ্রপাতে তিন জেলায় ৪ জনের মৃত্যু সদ্য. ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৮ হাজার সদ্য. আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বেনামি গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে দেশ অস্থিতিশীলের চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী সদ্য. মক্কা চুক্তির পরপরই সৌদিতে হুতিদের হামলা, কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তান-তুরস্ক সদ্য. আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর তথ্য ও নথি চেয়ে বিএফআইইউকে দুদকের চিঠি সদ্য. জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবিতে হেফাজতে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিব সদ্য. সারাদেশে একযোগে ৯৯ বিচারককে বদলি সদ্য. শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণে সরকার কি উদ্যোগ নিয়েছে- জানতে চাইল সংসদীয় কমিটি সদ্য. আগামী মাস থেকে বাংলা কিউআরে সঙ্গে সঙ্গেই টাকা পাবেন বিক্রেতা সদ্য. বজ্রপাতে তিন জেলায় ৪ জনের মৃত্যু সদ্য. ডেঙ্গুতে আরও ৫ মৃত্যু, আক্রান্ত ৫৮ হাজার সদ্য. আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী সদ্য. বেনামি গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে দেশ অস্থিতিশীলের চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী সদ্য. মক্কা চুক্তির পরপরই সৌদিতে হুতিদের হামলা, কঠিন পরীক্ষায় পাকিস্তান-তুরস্ক সদ্য. আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর তথ্য ও নথি চেয়ে বিএফআইইউকে দুদকের চিঠি