বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে মেরু অঞ্চলের বরফের চাদর গলে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী খরা, সাইক্লোন, বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ, বিধ্বংসী দাবানল এবং জীববৈচিত্র্যের ক্রমাগত সংকোচন, সব মিলিয়ে পৃথিবীর পরিবেশগত সংকট এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয় বরং তা ক্রমেই আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: পরিবেশ রক্ষায় কতটা চাপ প্রয়োগ করা উচিত? পরিবর্তনের জন্য কতটা কঠোর হওয়া সমীচীন? আর কোথায় প্রতিবাদ শেষ হয়ে শুরু হবে সংঘাত?
একদল মনে করেন, সরকার, উন্নয়ন অংশীদার, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা, নীতি সংস্কার, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনার পথই দীর্ঘমেয়াদে বেশি টেকসই। তাদের কাছে পরিবেশ রক্ষা কেবল আন্দোলনের বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।
অন্যদিকে, পরিবেশবাদীদের আরেকটি ধারা মনে করে, জলবায়ু ও পরিবেশগত সংকট যে গতিতে গভীর হচ্ছে, তার তুলনায় কেবল আলোচনা, সমঝোতা ও ধীরগতির সংস্কার যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, এখন প্রয়োজন আরও দৃঢ়, দৃশ্যমান ও চাপ সৃষ্টিকারী পরিবেশ আন্দোলন, যা সরকার, শিল্পখাত ও সমাজকে দ্রুত ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারে।
পরিবেশ আন্দোলনের (গ্রীন মুভমেন্টের) দুই ধারা
মূলধারার পরিবেশবাদ: সহযোগিতা ও পরিবর্তনের পথ
আমরা যেসব পরিবেশবাদী সংগঠনকে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, জলবায়ু পদযাত্রা কিংবা জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে দেখতে পাই, তাদের বড় একটি অংশ সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দেয়। শক্তিশালী পরিবেশ আইন, নীতিগত সংস্কার, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতাকে তারা পরিবেশ সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে।
এই ধারার মূল বিশ্বাস হলো, পরিবর্তন টেকসই করতে হলে শুধু প্রতিবাদ নয়, নীতি ও প্রতিষ্ঠানকেও পরিবর্তনের অংশ হতে হবে। ধীরগতি কখনো কখনো হতাশাজনক হতে পারে, কিন্তু ধারাবাহিক নীতি সংস্কার ও সহযোগিতার মাধ্যমে অর্জিত পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে।
চরমপন্থী পরিবেশবাদ: আপসহীন প্রতিবাদের পথ
চরমপন্থী পরিবেশবাদীরা এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেন। “Earth First!” এবং “Earth Liberation Front” এর মতো সংগঠনগুলোর উত্থান ঘটে মূলত ১৯৭০ এর দশকের শেষভাগ ও ১৯৮০ এর দশকে। মূলধারার পরিবেশ আন্দোলনের ধীরগতি এবং আপসকামী অবস্থানে হতাশ হয়ে তারা পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে আরও সরাসরি ও সংঘাতপূর্ণ প্রতিবাদের পথ বেছে নেয়। তাদের কর্মকাণ্ডের একটি বিতর্কিত দিক হলো সরাসরি প্রতিরোধ ও বিঘ্ন সৃষ্টিকারী প্রতিবাদ। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত প্রকল্প, যন্ত্রপাতি বা স্থাপনার বিরুদ্ধে কখনো কখনো এমন কর্মকাণ্ডও দেখা গেছে, যার মধ্যে অবকাঠামো বা সরঞ্জামের ক্ষতিসাধন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি অন্তর্ভুক্ত।
সমর্থকদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের পদক্ষেপ পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে জরুরি প্রতিরোধের একটি রূপ। সমালোচকদের মতে, তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড আইনগত ও সামাজিক সংঘাত বাড়াতে পারে এবং বৃহত্তর পরিবেশ আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ও জনসমর্থনকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এ কারণেই সমালোচকেরা কখনো এসব কর্মকাণ্ডকে “ইকো-টেররিজম” হিসেবে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, চরমপন্থী পরিবেশবাদীদের অনেকেই যুক্তি দেন, বন ধ্বংস, নদী দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা বড় শিল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড পরিবেশ ও মানুষের জন্য গভীর ক্ষতি ডেকে আনছে। ফলে তাদের প্রশ্ন “পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সীমারেখা কোথায়?”

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সৃষ্ট।
আপসের সীমা কোথায়?
“কোনো আপস নয়”-এই অবস্থান পরিবেশগত সংকটকে জনপরিসরে জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে। এটি এমন কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে, যেগুলো হয়তো ধীরগতির নীতি আলোচনায় গুরুত্ব পেত না। কিন্তু একই সঙ্গে অতিরিক্ত সংঘাত সম্ভাব্য সহযোগীদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং বৃহত্তর সামাজিক ঐকমত্য তৈরির পথ কঠিন করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, শুধু সমঝোতা ও ধীরগতির সংস্কারের ওপর নির্ভর করলেও দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশগত সংকটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হতে পারে।
তাই প্রশ্নটি সম্ভবত “প্রতিবাদ নাকি সহযোগিতা”-এতটা সরল নয়। দৃঢ় জনচাপ যেমন নীতিনির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তেমনি কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের জন্য সরকার, প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক খাত ও নাগরিক সমাজের সহযোগিতাও অপরিহার্য।
পরিবেশগত ন্যায়বিচার: একসঙ্গে মানুষ ও প্রকৃতি
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো “Ecological Justice” বা পরিবেশগত ন্যায়বিচার। এই ধারণা পরিবেশ সুরক্ষাকে সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত করে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দরিদ্র, প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী যেন আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারণ পরিবেশ রক্ষার নামে এমন কোনো পরিবর্তনও কাম্য নয়, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বহন করতে হয় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষকে। তাই পরিবেশ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রকৃতি রক্ষা এবং মানুষের অধিকার, এ দুটিকেই একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে।
শেষ কথা: পরিবেশবাদ কোন পথে?
শেষ পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার লড়াইকে “চরমপন্থা” বনাম “মূলধারা” এই সরল দ্বন্দ্বে আবদ্ধ করা যায় না। কারণ পরিবেশগত পরিবর্তন কখনো শুধু প্রতিবাদে আসে না, আবার শুধু সমঝোতার টেবিলেও আসে না।
প্রয়োজন এমন একটি পথ, যেখানে জনসচেতনতা প্রতিবাদের শক্তি তৈরি করবে, প্রতিবাদ নীতিনির্ধারকদের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করবে, আর সংলাপ ও অংশীদারিত্ব সেই চাপকে বাস্তব নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেবে। একই সঙ্গে পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃতি রক্ষার লড়াই মানুষের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়।
পৃথিবীর পরিবেশগত সংকট যত গভীর হচ্ছে, ততই জরুরি হয়ে উঠছে এই সমন্বিত পথ খুঁজে নেওয়া। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন শুধু “কীভাবে প্রতিবাদ করব?”-তা নয়; বরং “কীভাবে এমন পরিবর্তন আনা যায়, যা একই সঙ্গে প্রকৃতিকে সুরক্ষিত করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই হবে?”
হৃদয় হাসান
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক ফিচার লেখক
ইমেইল: redoy.hassan_env@aol.com
সদ্য সংবাদ/এসএস