জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ উন্নয়ন প্রকল্প। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি কিংবা অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে জলবায়ু সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই সবুজ রূপান্তরের আড়ালে নতুন এক প্রশ্নও সামনে আসছে এর প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে কারা?
কোনো এলাকায় বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে উঠলে কমতে পারে কার্বন নিঃসরণ, বাড়তে পারে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার। কিন্তু সেই প্রকল্পের জন্য কৃষিজমি, বন বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ কমে গেলে তৈরি হয় নতুন উদ্বেগ। বিশেষ করে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা যখন চলে যায় বড় কোম্পানি বা বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের হাতে, আর পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের বোঝা পড়ে স্থানীয় মানুষের ওপর, তখনই প্রশ্ন ওঠে এই সবুজ উন্নয়ন আসলে কার স্বার্থে?
এমন বাস্তবতা থেকেই আলোচনায় এসেছে ‘Eco-colonialism’ বা ‘পরিবেশগত উপনিবেশবাদ’ ধারণা। জলবায়ু রক্ষার নামে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্ষমতা, সম্পদ ও সুবিধার বণ্টন কতটা ন্যায্য এই প্রশ্নই মূলত এই ধারণার কেন্দ্রে।
উপনিবেশবাদ কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে?
ঔপনিবেশিকতার প্রচলিত চিত্র আমাদের পরিচিত। একটি শক্তিশালী দেশ অন্য একটি দুর্বল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে। সেই অঞ্চলের জমি, শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করছে নিজের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার জন্য। স্থানীয় জনগোষ্ঠী হয়ে উঠছে সস্তা শ্রমের উৎস এবং উপনিবেশ হয়ে উঠছে কাঁচামাল ও পণ্যের বাজার। কিন্তু পৃথিবী বদলেছে। আজ অধিকাংশ দেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের পুরোনো কাঠামোও অনেকটাই ইতিহাস। কিন্তু সম্পদ, অর্থনীতি ও ক্ষমতার অসমতা কি শেষ হয়েছে? ইকো-কলোনিয়ালিজম নিয়ে বিতর্কটি ঠিক এখানেই।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন ট্রেডিং কিংবা খনিজ আহরণের মতো “সবুজ” উদ্যোগগুলো অনেক সময় এমন বৈষম্য তৈরি করে, যেখানে উন্নত দেশগুলো পরিবেশগত সুবিধা পেয়ে যায়; কিন্তু এর বিপরীতে প্রয়োজনীয় জমি, সম্পদ, শ্রম ও পরিবেশগত বড় মাশুলটি দিতে হয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশ এবং সেখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে।
অর্থাৎ, উপনিবেশবাদের ভাষা বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার সম্পর্ক কি সবসময় বদলেছে !
সবুজ বিপ্লবের অন্ধকার দিক কোথায়?
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসতেই হবে, এ নিয়ে বিজ্ঞানী মহল এবং নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে একটি স্পষ্ট ঐকমত্য রয়েছে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্যও নিজস্ব সম্পদ প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির জন্য লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেলসহ বিভিন্ন খনিজের চাহিদা বাড়ছে। এখানেই একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য তৈরি হয়।
যে প্রযুক্তি বিশ্বের এক প্রান্তে কার্বন কমানোর প্রতীক, তার কাঁচামাল আহরণের প্রক্রিয়া অন্য প্রান্তে পরিবেশ ও মানুষের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর কোবাল্ট খনিতে শিশুশ্রম ও বিপজ্জনক কর্মপরিবেশ এর বিষয়টি। আবার বলিভিয়া, চিলি ও আর্জেন্টিনার লিথিয়াম ট্রায়াঙ্গেল অঞ্চলের খনিতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পানি সংকটের বিষয়টি এখন বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে।
অর্থাৎ, বৈদ্যুতিক গাড়ি হয়তো শহরের রাস্তায় দূষণ কমাবে। কিন্তু সেই গাড়ির ব্যাটারির কাঁচামাল কোথা থেকে আসছে, সেখানকার পরিবেশ, সমাজ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে সেটিও এখন ভাবনার বিষয়।

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সৃষ্ট।
কার্বন কমছে, নাকি শুধু কার্বনের ঠিকানা বদলাচ্ছে?
জলবায়ু রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কার্বন নির্গমনের অসম বণ্টন। ঐতিহাসিকভাবে শিল্পায়নের বড় অংশ ঘটেছে উন্নত দেশগুলোতে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক গুরুতর প্রভাব বহন করছে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো। ফলে একটি বৈশ্বিক বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে: একদিকে উন্নত দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতিকে আরও সবুজ করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সেই সবুজ রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, ভূমি ও উৎপাদন ব্যবস্থা বিশ্বের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
তখন প্রশ্ন ওঠে আমরা কি সত্যিই বিশ্বব্যাপী নির্গমন কমাচ্ছি, নাকি পরিবেশগত ক্ষতির একটি অংশ শুধু অন্য দেশের ভূখণ্ডে সরিয়ে দিচ্ছি?
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। একই সঙ্গে এটি নদী, হাওর, বিল, বন, উপকূল, চর ও কৃষিভিত্তিক জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Renewable Energy) দরকার; আমাদের জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Financing) দরকার; কার্বন বাজারের (Carbon Market) সুযোগও সামনে আসছে; একই সাথে প্রকৃতি ভিত্তিক সমাধান (Nature Based Solution) দরকার।
কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি প্রশ্ন রাখতে হবে: প্রস্তাবিতব্য “সবুজ উন্নয়ন” প্রকল্পের পরিবেশগত, জীববৈচিত্র্যগত এবং সামাজিক প্রভাব সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়েছে কি না?
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব হতে হবে। কিন্তু সেই সবুজ ভবিষ্যৎ যদি অন্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রম বা মানবাধিকারকে শোষণ করে গড়ে ওঠে, তবে তা হবে পুরোনো উপনিবেশবাদকে বিদায় জানিয়ে তারই এক নতুন সংস্করণকে স্বাগত জানানো।
তাই সবুজ ভবিষ্যতের আসল প্রশ্ন শুধু 'How green is our development?' অর্থাৎ, “আমাদের উন্নয়ন কতটা পরিবেশবান্ধব?” - এটিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আরও কঠিন প্রশ্নটি হলো 'Whose green future are we building?' অর্থাৎ, “কার সবুজ ভবিষ্যৎ আমরা নির্মাণ করছি?” কারণ পৃথিবীকে বাঁচানোর অজুহাতে যদি পৃথিবীরই কিছু মানুষকে পেছনে ফেলে যেতে হয়, তবে সেই সবুজ ভবিষ্যতের স্থায়িত্ব নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দেয়।
হৃদয় হাসান
পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক ফিচার লেখক
ইমেইল: redoy.hassan_env@aol.com
সদ্য সংবাদ/এসএস