মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই ভারতের নয়াদিল্লিতে বসছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) শুরু হতে যাওয়া দুই দিনের এই সম্মেলনে যোগ দিতে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। সম্মেলনের আগের দিন শুক্রবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এবারের সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংও অংশ নিচ্ছেন। ২০১৯ সালের পর এটি তাঁর প্রথম ভারত সফর।
বিশ্বরাজনীতিতে বাড়তে থাকা সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবারের সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সম্মেলনের আগে দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, পুরো বিশ্ব এখন একটি জটিল সময় অতিক্রম করছে। তাঁর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের ওপর চাপ সংকটময় ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পেজেশকিয়ানের ভাষ্য, একতরফা আধিপত্যবাদের বিকল্প হিসেবে ব্রিকস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে জোটের সদস্যদের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলাদা বৈঠকও করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান সামরিক অভিযান—দুটি সংঘাতই এবারের সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুক্রবার ভ্লাদিমির পুতিনকে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানান নরেন্দ্র মোদি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফরের পর এটি পুতিনের দ্বিতীয় দিল্লি সফর। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা অংশীদার।
ব্রিকস নেতাদের স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংস্কৃত ভাষায় একটি বার্তাও দিয়েছেন মোদি। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘সবার সঙ্গে নয়, শুধু সজ্জন ও গুণীজনের সঙ্গেই বন্ধুত্ব ও আলোচনা করা উচিত।’ সম্মেলনের আগে তাঁর এই বক্তব্যকে ঐক্য ও সহযোগিতার আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বনেতাদের মধ্যে এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে আলোচিত উপস্থিতি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের। ২০১৯ সালে তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর সাত বছর পেরিয়ে তাঁর এটি প্রথম ভারত সফর।
২০২০ সালের গালওয়ান সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কের অবনতি হলেও গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে ধীরে ধীরে উত্তেজনা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিমান যোগাযোগ, ভিসা, উচ্চপর্যায়ের সংলাপ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং শুক্রবার বলেন, যোগাযোগ জোরদার, সহযোগিতা বাড়ানো এবং মতপার্থক্য সঠিকভাবে নিরসনের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত চীন। তবে সীমান্ত বিরোধ, বাড়তে থাকা বাণিজ্যঘাটতি ও আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।
এদিকে সি চিন পিংয়ের সফরের প্রতিবাদে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করেন কয়েকজন নির্বাসিত তিব্বতি। তিব্বতে চীনের নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে যাত্রা শুরু করা ব্রিকস বর্তমানে ১১ সদস্যের জোট। দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়া জোটটিতে যুক্ত হয়েছে।
তবে সদস্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যও বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে ঘিরে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান পরস্পরের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন।
ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক হর্ষ ভি পন্ত বলেন, এবারের ব্রিকস সম্মেলনে সবচেয়ে বড় বিভাজনরেখা হবে উপসাগরীয় সংঘাত। তাঁর মতে, গত বছর ব্রিকসের সম্প্রসারণকে সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও এখন সেটিই জোটটির বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষক শিলান শাহের মতে, ইরান যুদ্ধ ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। তিনি বলেন, গত মে মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও সদস্যরা একটি যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি।
ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারত্ব ধরে রেখেছে ভারত। একই সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে আসছে নয়াদিল্লি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে এই বহুমাত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখাই এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। একই টেবিলে এমন নেতারা বসছেন, যাঁদের কেউ যুদ্ধে জড়িত, কেউ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং কেউ একই আঞ্চলিক সংকটে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে রয়েছেন।
সম্মেলন ঘিরে ভারতের রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রধান সড়ক, হোটেল ও সম্মেলনস্থল ভারত মণ্ডপম ঘিরে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। মোদির বিশাল প্রতিকৃতি ও ব্রিকসের ব্যানারে সাজানো হয়েছে নয়াদিল্লি। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় এখন আন্তর্জাতিক মহল।
তথ্যসূত্র: এএফপি
সদ্য সংবাদ/ এআর