বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতি ও দলটির ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তার বড় ছেলে তারেক রহমান যে বিএনপির নেতৃত্বে আসছেন, তা ছিল অনেকটাই প্রত্যাশিত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি কি মায়ের রেখে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবেন এবং বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলকে সামনে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন কি না।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের সময় থেকেই দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় হন তারেক রহমান। সে সময় তিনি তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি নির্বাসনে চলে যান। লন্ডনে অবস্থান করলেও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান এবং কার্যত দল পরিচালনার ভার তার কাঁধেই এসে পড়ে।
এই সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও একুশে অগাস্ট গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক মামলায় সাজা হয়। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পালাবদলে তিনি এসব মামলা থেকে খালাস পান। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে কিংবা পেছনে ফেলে নতুন করে দল গুছিয়ে নেওয়াই এখন তার বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিয়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার করাই তারেক রহমানের সামনে প্রথম বড় পরীক্ষা। খালেদা জিয়ার অভিভাবকত্ব হারানো দলটির জন্য ধাক্কা হলেও তারেক আগে থেকেই নেতৃত্বে থাকায় এই শূন্যতা সামাল দেওয়া কঠিন হবে না বলে মনে করেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তার মতে, রাজনীতিতে কেউই চিরস্থায়ীভাবে অপরিহার্য নয়, সময়ের সঙ্গে শূন্যতা পূরণ হয়ে যায়।
মায়ের মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় বিপুল সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে দেশে ফেরেন তারেক রহমান। এখন তাকে শুরু করতে হবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও নীতিগত অবস্থানকে সামনে রেখে, তবে পুরনো ছাঁচে না থেকে নিজের মতো পথ তৈরি করাই হবে বড় কাজ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান মনে করেন, খালেদা জিয়ার সময়কার উপদেষ্টা ও সহায়ক টিম বয়স ও প্রজন্ম পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে। ফলে তারেক রহমানের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—নিজের আস্থাভাজন একটি টিম গড়ে তোলা এবং যুক্তিসংগত পরামর্শ গ্রহণের মানসিকতা ধরে রাখা।
খালেদা জিয়ার জানাজায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, প্রয়াত নেত্রীর জীবনসংগ্রাম সামনে রেখে তারেক রহমানের নেতৃত্বেই দল এগিয়ে যাবে এবং গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়নের পথে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য থাকবে।
বিএনপির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমান মায়ের সঙ্গে রাজপথে নামেন এবং ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯০-এর দশকে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচনের উদ্যোগ নেন তিনি। ২০০১ সালের আগে স্থানীয় সমস্যা ও সুশাসন নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকায় একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করেন, তবে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলেও কোনো সরকারি পদ নেননি।
২০০২ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হন। ২০০৫ সালে দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলনের আয়োজন করেন। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়ে ২০০৮ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে যান। সেখানে থেকেই ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০১৮ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
নির্বাসিত জীবনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও গ্রেনেড হামলার অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। ‘হাওয়া ভবন’কে কেন্দ্র করে তার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এসব অভিযোগের ছায়া কাটিয়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতা কতটা বাড়াতে পারবেন, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরে তারেক রহমান এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য, দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নির্বাচন থেকে তারা বাইরে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াত এবার বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। নতুন দল ও জোটের উত্থানে রাজনীতির মাঠ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি কতটা উদারপন্থী হবে, নাকি আগের অবস্থানেই থাকবে—সে প্রশ্নও উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, দলটি তার ঐতিহ্যগত রক্ষণশীল ভিত্তি ও সীমিত উদার দৃষ্টিভঙ্গির মিশ্রণেই এগোবে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ নির্বাসন, বিতর্কিত অতীত ও বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং বিএনপিকে একটি কার্যকর, গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে এগিয়ে নেওয়া। সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম