ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানকে আগের একটি অস্ত্র মামলায় জামিন করে দেওয়া বিএনপিপন্থী আইনজীবী কায়সার কামালের বহিষ্কারের দাবিও জানান তারা। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) রাতে শাহবাগ মোড়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা প্রকাশ্যে এ দাবি তোলেন।
এর আগে জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগে এসে অবস্থান নেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। সন্ধ্যার পর থেকে সেখানে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। আন্দোলনকারীরা রাতভর অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার পর সরেজমিনে দেখা যায়, শাহবাগ মোড়ের চারদিকেই বিক্ষোভকারীদের অবস্থান। এর ফলে শাহবাগ দিয়ে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে। তবে আশপাশের কয়েকটি সড়কে সীমিত পরিসরে যান চলাচল করতে দেখা যায়।
অবরোধ কর্মসূচিতে বক্তব্য দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি। এ সময় আন্দোলনকারীদের স্লোগানে শাহবাগ মোড় উত্তাল হয়ে ওঠে— ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ্য হাদি লড়াই করে’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ও ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা জানান, তারা সারারাত অবস্থান করবেন, তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বলেন, যে কণ্ঠে রাজপথে স্লোগান শোনা যেত, আজ তাকে কবরে রেখে কথা বলতে হচ্ছে—এটি পুরো ইনকিলাব টিমের জন্য অপূরণীয় শোক।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট–পরবর্তী সময়ে দেশে অনেক নেতা তৈরি হলেও ওসমান হাদি নিজেকে কখনো নেতা বলেননি। সবসময় নিজেকে ইনকিলাবের একজন কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই চরিত্রই তাকে মানুষের নেতা বানিয়েছে। মৃত্যুর পরও তিনি আন্দোলনের শক্তি ও লড়াইয়ের প্রেরণা হয়ে আছেন।
বিচার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতির অভাব নিয়ে তিনি প্রশাসন ও সরকারের সমালোচনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাদির মৃত্যুর পর খুনিদের অবস্থান, পলাতক থাকা বা দেশে থাকার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও স্পষ্ট তথ্য নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অবরোধ কর্মসূচিতে শহিদ ওসমান হাদির ভাই শরিফ ওমর বিন হাদি বলেন, সরকারের আচরণে বিচারের বিষয়ে আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট। তিনি বলেন, ওসমান হাদির বিচার এখন সারা দেশের মানুষের দাবি। বিচার না হওয়া পর্যন্ত ঘরে না ফেরার ঘোষণা দিয়ে তিনি আরও কঠোর কর্মসূচির ইঙ্গিত দেন।
এর আগে ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় লাগাতার আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় বলে জানান সংগঠনের নেতারা।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় একটি পানির ট্যাংকির সামনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের গুলিতে গুরুতর আহত হন শরিফ ওসমান হাদি। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যরা ‘শহিদী শপথ’ নেন এবং ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে হত্যার বিচার সম্পন্ন ও ‘ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করেন।