ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও নবীনগরে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নাসিরনগরে সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে ডিলারশিপ বরাদ্দ পাওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। অন্যদিকে, নবীনগরে সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের একাধিক আত্মীয়ের নাম তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশ।
দুই উপজেলায় নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে সংসদ সদস্যদের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের যোগ্যতা ও নির্ধারিত নীতিমালাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কি না।
নাসিরনগর উপজেলায় সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে, বোনজামাই ও ভাগ্নের স্ত্রীর নামে সার ডিলারশিপ বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গোকর্ণ ইউনিয়নে এমপির ছেলে আদনান সাদী ‘মেসার্স আলীয়াহ ট্রেডার্স’, নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে তাঁর বোনজামাই আরক মিয়া ‘মেসার্স আয়ান ট্রেডার্স’ এবং গোয়ালনগর ইউনিয়নে তাঁর ভাগ্নের স্ত্রী নুরুন্নাহার আক্তার স্বর্ণা ‘এস এস ট্রেডার্স’-এর নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন।
একই সংসদ সদস্যের পরিবারের একাধিক সদস্যের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে। এ ঘটনায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন স্থানীয়রা।
গত ৮ অক্টোবর নতুন ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভার ১০৬টি ডিলারশিপের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৮২৫ জন। যাচাই-বাছাই শেষে ২৯২ জনের নাম সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান জানান, উপজেলা থেকে পাঠানো নামগুলো যাচাই করে সুপারিশসহ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে দু-একটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তালিকা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে বলেও জানান তিনি।
নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে এই কর্মকর্তা বলেন, তিনি নিজে এমন কোনো লেনদেন করেননি এবং অন্য কারও বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তাঁর জানা নেই। তবে উপজেলা পর্যায়ে তালিকা তৈরির সময় হস্তক্ষেপ হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নবীনগর উপজেলায় সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের একাধিক আত্মীয় নতুন সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ তালিকায় ভাগিনা, ভাগিনার ছেলে, ভাগনির মেয়ের জামাই এবং বোনের দেবরের নাম রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিটঘর ইউনিয়নে ‘মেসার্স মহসীন ট্রেডার্স’-এর মালিক মোহাম্মদ মহসীন এমপির ভাগিনা। ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নে ‘নিউ দায়েমি ট্রেডার্স’-এর গাজী মার্জিদুল বিজয় তাঁর ভাগিনার ছেলে। রতনপুর ইউনিয়নে ‘মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স’-এর কাজী মো. কাইউম তাঁর ভাগনির মেয়ের জামাই বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বড়াইল ইউনিয়নে ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক রুবেলকে এমপির মামাতো বোনের ছেলে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও চেয়ারম্যান আবুল বাশারের ছেলে। কৃষ্ণনগর ইউনিয়নে ‘এস কে এগ্রো ফার্ম লিমিটেড’-এর কবীর খানের সঙ্গে এমপির বোনের দেবরের সম্পর্ক রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বড়িকান্দি ইউনিয়নে ‘মেসার্স হাবিব এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক হাবিবুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
নবীনগরে ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের তুলনায় আত্মীয়স্বজন ও অন্য রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিরা বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন।
কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সদস্য কেএম মামুনুর রশীদ ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নবীনগরে কৃষক দলের কাউকে ডিলার নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়টি তুলে প্রশ্ন তোলেন।

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল করিমের অভিযোগ, নিয়োগের ক্ষেত্রে আত্মীয় ও ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় যুবদলের সদস্য ও সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান চৌধুরী পাপ্পুও নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক ভূমিকা ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
উপজেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বাবুলসহ আরও কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন ইউনিয়নে সংসদ সদস্যের আত্মীয়দের ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি সামনে এনেছেন।
সার ডিলার নিয়োগের সঙ্গে কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ এবং কৃষি উপকরণের ন্যায্য বণ্টন জড়িত। তাই নাসিরনগর ও নবীনগরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলো যাচাই করে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়দের অনেকে। একই সঙ্গে যোগ্যতা ও নিয়মের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
সদ্য সংবাদ/এসএস