রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ছাড়াই দাফন করা হয়েছে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারকে। মৃত্যুর পর গ্রামের বাড়িতে মরদেহ নেওয়া হলেও দীর্ঘ অপেক্ষার পরও গার্ড অব অনারের ব্যবস্থা না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় মারা যান আব্দুস সাত্তার। তিনি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবনের শেষ সময়গুলো ছেলের সঙ্গে ঢাকায় কাটাচ্ছিলেন তিনি।
ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মরদেহ পৌঁছালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননার অংশ হিসেবে গার্ড অব অনারের অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত হননি। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ছাড়াই তাকে দাফন করা হয়।
পরিবারের দাবি, গার্ড অব অনারের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলামকে একাধিকবার জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ার কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন আদেশ, ২০২০ অনুযায়ী, দাফনের আগে জাতীয় পতাকায় কফিন আবৃত করা, সরকারের অনুমোদিত প্রতিনিধির পুষ্পস্তবক অর্পণ, পুলিশের সশস্ত্র সালাম এবং বিউগলে করুণ সুর বাজানোর বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এ গার্ড অব অনার পরিচালনা করেন।
ভাইকে শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছেন আব্দুস সাত্তারের ভাই শাহজাহান। তিনি বলেন, নয় মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য সম্মানটুকুও নিশ্চিত করা যায়নি। ভাইকে যথাযথ মর্যাদায় বিদায় জানানোর ইচ্ছা থাকলেও তা পূরণ হয়নি।
একই গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লাও ঘটনাটিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব না হলেও প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি অন্তত উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টারও উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানান, গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালামের ব্যবস্থা করতে প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেছিলেন। তবে ইউএনওর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাড়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ তার।
অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না বলে দাবি করেছেন ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, গার্ড অব অনারের জন্য পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। বিউগলের সুর বাজাতে পুলিশ লাইনের একটি দলও এসেছিল। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় পুলিশ এককভাবে গার্ড অব অনার দিতে পারেনি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইউএনও মুন্নী ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজি আকতার জানিয়েছেন, গার্ড অব অনার না দেওয়া এবং পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতি প্রকাশ না করার কারণ জানতে ব্রাহ্মণপাড়ার ইউএনওর কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকেও অবহিত করা হয়েছে। ব্যাখ্যা পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সদ্য সংবাদ/এজে