ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির প্রস্তাবে আপত্তি, কুবিতে পক্ষে-বিপক্ষে ছাত্রদল ও অন্য সংগঠন

কুবি প্রতিনিধি
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:০৭:৩৪
মোহাম্মদ ইব্রাহীম

সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির, জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তারা। তবে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে করেন ছাত্রদল। তাদের মতে বেকারত্ব দূরীকরণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করতেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ছাত্রনেতারা দাবি করেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মেধার মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা প্রার্থীরা ভাইভায় কম নম্বর পেয়ে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি লবিং, তদবির, দলীয় পরিচয় ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের। তাদের মতে, লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীরাও ভাইভায় বেশি নম্বর পাওয়ার মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

তবে ছাত্রদল বলেছে, ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি সরকারের নেওয়া একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। তাদের মতে, বেকারত্ব, বর্তমান বাস্তবতা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন সমস্যা এবং অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধসহ নানা বিষয় বিবেচনা করেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের মতের সঙ্গে কোনো সিদ্ধান্ত না মিললে তা সমালোচনা বা বিরোধিতা করার অধিকার সবার রয়েছে। তবে দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক, সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলক পন্থা অনুসরণ করা উচিত।

কুবি শাখা ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি আবছার উদ্দিন ইফতি বলেন, “সরকার যখন সুখে থাকে, তখনই তাদের ভূতে কিলায়! ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়াকে দলীয়করণের নানা অপচেষ্টা আমরা লক্ষ্য করছি। সম্প্রতি সরকারি চাকরির নিয়োগে ভাইভার নম্বর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে যেখানে মেধা ও যোগ্যতার তুলনামূলক নিরপেক্ষ মূল্যায়ন সম্ভব, সেখানে ভাইভার নম্বর এত বাড়ানোর প্রয়োজন কেন? চাকরিপ্রত্যাশীদের আশঙ্কা হচ্ছে, এই সুযোগ কি রেফারেন্স, তদবির, দলীয় পরিচয় ও স্বজনপ্রীতির জন্য নতুন দরজা খুলে দেবে না?”

তিনি আরও বলেন, “আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানাই, মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থার স্বার্থে অবিলম্বে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন। অন্যথায় চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ যদি রাজপথে বিস্ফোরিত হয়, সেই পরিস্থিতি সরকারের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।”

কুবি শাখা জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক নিলয় বড়ুয়া বলেন, “সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে লিখিত পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা অনেক প্রার্থী বৈষম্যের শিকার হতে পারেন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলীয়করণের সুযোগ তৈরি হবে এবং বড় বড় সরকারি পদে নিজেদের পছন্দের লোক বসানোর পথ তৈরি হতে পারে। দেশের অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী রাতদিন পরিশ্রম করে, দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়ে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। লিখিত পরীক্ষায় ভালো ফল করার পর যদি ভাইভায় গিয়ে তারা দলীয়করণের মুখোমুখি হন, তাহলে তাদের চাকরি পাওয়ার যে প্রত্যাশা, সেটি আবারও ভেঙে যাবে। আমরা অতীতে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের লোক বসানোর যে সংস্কৃতি দেখেছি, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর আমরা কোনোভাবেই তার পুনরাবৃত্তি চাই না।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ মেধা, যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হোক। এরপরও যদি সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি উপেক্ষা করে ভাইভায় নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন করে; তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আমরা কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলব।”

কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন আবির বলেন, “জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল চাকরিতে বৈষম্য দূর করে মেধাভিত্তিক ও ন্যায়সংগত নিয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকারই এখন দলীয় নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে ভাইভা পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর মতো অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ভাইভায় নম্বরের গুরুত্ব বাড়ানোর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লবিং, তদবির ও নিয়োগ-বাণিজ্যের সুযোগ আরও বাড়বে। এতে মেধাবী প্রার্থীরা দলীয় সুপারিশ বা লবিংয়ের সুযোগ না থাকায় ভাইভায় কম নম্বর পেয়ে পিছিয়ে পড়তে পারেন। অন্যদিকে, লিখিত পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীরাও সুপারিশের মাধ্যমে ভাইভায় বেশি নম্বর পেয়ে চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, দ্রুত এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করুন। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।”

এ বিষয়ে ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, “ভাইভার নম্বর বৃদ্ধি মূলত একটি সরকারি সিদ্ধান্ত। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি সরকার বেকারত্ব, বর্তমান বাস্তবতা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন সমস্যা এবং অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধসহ নানা বিষয় বিবেচনা করেই নিয়েছে। সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মতের সঙ্গে না মিললে তা সমালোচনা বা বিরোধিতা করার অধিকার সবার রয়েছে। তবে সেটি হতে হবে নিয়মতান্ত্রিক, সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলক। সিদ্ধান্তটি শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি করলে তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করতে পারে। সরকার সবদিক পর্যালোচনা করে যদি মনে করে, ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব হবে, তাহলে আমরা এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। আমরা দেখেছি, কিছু শিক্ষার্থী এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। "

তিনি আরও বলেন, “ তাদের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন শালীনতা বজায় রেখে যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের মতামত তুলে ধরে। একই সঙ্গে যারা সিদ্ধান্তটির পক্ষে রয়েছে, তাদের মতামতের প্রতিও সম্মান দেখাতে হবে। ভিন্নমত থাকতেই পারে, তবে তা প্রকাশের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা জরুরি। সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত যদি সত্যিই শিক্ষার্থীদের স্বার্থবিরোধী হয়, তাহলে আমরাও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তা পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানাব। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে দায়িত্ব হলো নিয়মতান্ত্রিক, সুশৃঙ্খল ও শালীনভাবে নিজেদের দাবি ও মতামত তুলে ধরা। তবে গালাগালি, অশোভন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা নোংরা আচরণের মাধ্যমে কোনো দাবি আদায়ের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের অশোভন কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত, আমরা তাদের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।”

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে ১১ থেকে ১২তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ভাইভার নম্বর ১০। নতুন প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ৫০ নম্বর করার কথা বলা হয়েছে। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ভাইভার নম্বর ১০। প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা বাড়িয়ে ৪০ নম্বর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ভাইভার নম্বর ১০। নতুন প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ২৫ নম্বর করার কথা বলা হয়েছে।

সদ্য সংবাদ/এসকে

ক্যাম্পাস ব্রেকিং

মন্তব্য (0)

মন্তব্য করুন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!

বিজ্ঞাপনের জন্য খালি স্পেস

এই বিভাগের আরও খবর

ক্যাম্পাস থেকে সর্বশেষ সংবাদ

শিরোনাম:
সদ্য. গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ. লীগের মিছিলের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩২ সদ্য. দেশকে পুনর্গঠন করতে চাইলে কেউ আমাদের ঠেকাতে পারবে না: প্রধানমন্ত্রী সদ্য. নয়াদিল্লিতে আজ শুরু ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন সদ্য. নিজ হাতে হাসপাতালের আঙিনা পরিষ্কার করলেন প্রতিমন্ত্রী সদ্য. ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে এখনো বিচারাধীন আরও অর্ধশত মামলা সদ্য. ভাইভায় বিশেষ নম্বর দিয়ে কাউকে পাস করানোর পরিকল্পনা নেই: পানিসম্পদমন্ত্রী সদ্য. দুর্গাপূজায় ইলিশ চায় ভারত, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান সদ্য. ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. ড্রোন হামলার কারণে তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি সদ্য. যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়া-ইরানের নেতাদের স্বাগত জানাল ভারত সদ্য. গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ. লীগের মিছিলের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩২ সদ্য. দেশকে পুনর্গঠন করতে চাইলে কেউ আমাদের ঠেকাতে পারবে না: প্রধানমন্ত্রী সদ্য. নয়াদিল্লিতে আজ শুরু ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন সদ্য. নিজ হাতে হাসপাতালের আঙিনা পরিষ্কার করলেন প্রতিমন্ত্রী সদ্য. ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে এখনো বিচারাধীন আরও অর্ধশত মামলা সদ্য. ভাইভায় বিশেষ নম্বর দিয়ে কাউকে পাস করানোর পরিকল্পনা নেই: পানিসম্পদমন্ত্রী সদ্য. দুর্গাপূজায় ইলিশ চায় ভারত, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান সদ্য. ডেঙ্গু মোকাবিলায় দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা প্রধানমন্ত্রীর সদ্য. ড্রোন হামলার কারণে তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ করল সৌদি সদ্য. যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়া-ইরানের নেতাদের স্বাগত জানাল ভারত