যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের পর তেহরানে উল্লাসে মেতেছেন হাজারো ইরানি। মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনায় সরব হন তাঁরা। বুধবার রাজধানী তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূতাবাসের সামনে আয়োজিত বার্ষিক সমাবেশে অংশ নিয়ে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা।
সমাবেশে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ ও ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান দেন অংশগ্রহণকারীরা। তাঁদের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন ব্যানার। একটি ব্যানারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শিকলে বাঁধা রক্তাক্ত বুলডগ হিসেবে দেখানো হয়। অন্য প্রান্তে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আদলে শয়তানের অবয়ব তুলে ধরা হয়।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও উঠে আসে সমাবেশে। একটি বড় ব্যানারে বিশ্বমানচিত্রের ওপর সারি সারি তেলের ড্রাম প্রদর্শন করা হয়। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন আয়োজকেরা। পাশাপাশি নিহত সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার দাবিও জানানো হয়।
১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল ও ৫২ মার্কিন নাগরিককে ৪৪৪ দিন জিম্মি রাখার ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর এ সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেওয়া মাহমুদখানি নামের ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ ও নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। কিন্তু তাতে ইরানকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথাও স্বীকার করেন তিনি। তবে তাঁর মতে, এত দিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান একাই অর্থনৈতিক চাপ সামলেছে। এখন অন্য দেশগুলোকেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তেহরানের পোশাক প্রস্তুতকারক ৬২ বছর বয়সী মজিদ হেইদারি মনে করেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। তাঁর দাবি, পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে তেহরান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফল ইরানিদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নিয়ে সংশয়ও প্রকাশ করেন তিনি।
একই ধরনের অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন ৪২ বছর বয়সী সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান—যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না।
এদিকে মার্কিন নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশটির প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধের বিরোধিতা কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ যে কারণেই হোক, মার্কিন জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়েছে। ইরান এই বার্তাকে সমর্থন করে।
তবে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনা এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি। নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কাও কাটেনি। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে মার্কিন সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের পর তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালায় বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা। পরে দূতাবাসের ৫২ কর্মীকে জিম্মি করা হয়। ৪৪৪ দিন ধরে চলা ওই সংকটের পর ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। সেই ঘটনার স্মরণেই প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সমাবেশ আয়োজন করে ইরান।
সূত্র: এএফপি
সদ্য সংবাদ/এসএস