জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের এই সিদ্ধান্তের পর নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এনসিপির এই নেতা।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।’
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকাকালে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া, পদায়নে অর্থ লেনদেন এবং বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডারে অনিয়ম ও বাণিজ্যের সঙ্গে আসিফ মাহমুদের সম্পৃক্ততা ছিল। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জেলায় ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সরকারি অর্থে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ, রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগে বলা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এসব অর্থ দিয়ে বিদেশে সম্পদ ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে অর্থ পাচারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অভিযোগটি দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে অনুসন্ধান শেষে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন আসিফ মাহমুদ। শুরুতে যুব ও ক্রীড়া এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে ২০২৪ সালের নভেম্বরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দেন আসিফ মাহমুদ। বর্তমানে তিনি দলটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সদ্য সংবাদ/এসকে